এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (16)
বিএনপির কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর মামলায় আ. লীগ নেতা গ্রেপ্তার
News Photocard (13)
প্রবাসীদের আবেদন ফরম পূরণেই মিলবে ই-পাসপোর্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চালু ১ সেপ্টেম্বর
News Photocard (6)
ডলি বেগমের পর জয় পেলেন তানভীর শাহনেওয়াজ—কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে এলো আরেক বাংলাদেশি মুখ
News Photocard (3)
পর্নোগ্রাফির আড়ালে প্রতারণা নির্যাতন ও অনলাইন বাণিজ্য
News Photocard
ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে যন্ত্রাংশের নামে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার আমদানি

ব্যান্ডউইথ সংকটের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ, ইন্টারনেট খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ব্যান্ডউইথ সংকটের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ,সংকট মোকাবিলায় নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। সময়মতো সক্ষমতা না বাড়ালে দেশে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা থাকায় ভবিষ্যতে বড় অবকাঠামোগত সংকট তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার অদূরে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।

‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি)। সংগঠনের সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইনসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা।

দ্রুত বাড়ছে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার

কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস।

এরপর ২০১৮ সালে তা বেড়ে ০ দশমিক ৭৬ টেরাবিট, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টেরাবিট এবং ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টেরাবিটে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে ব্যবহার প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ ২০১৩ থেকে ২০২৬—১৩ বছরে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার প্রায় ২৬০ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট।

এই দ্রুত প্রবৃদ্ধিই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সংকট কতটা বাড়তে পারে

কর্মশালায় দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা আগামী বছরগুলোতে আরও দ্রুত বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে চাহিদা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিটে, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিটে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ২০৩০ সালে চাহিদা ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে বলে কর্মশালায় জানানো হয়।

ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং শিল্প খাতে ডিজিটালাইজেশনের ফলে ব্যান্ডউইথের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

ফলে বর্তমান সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা

বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রধান ভরসা দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। কর্মশালায় জানানো হয়, ক্যাবল দুটির সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ টেরাবিট ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট।

এর বাইরে দেশের প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের একটি অংশ আইটিসি বা ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে অল্প কয়েকটি অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করে। কোনো একটি সাবমেরিন ক্যাবলে ত্রুটি দেখা দিলে বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের তুলনাও কর্মশালায় তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, ভারত ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে মাত্র দুটি।

তৃতীয় ক্যাবল এলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়

বাংলাদেশের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটি পর্যাপ্ত হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ, সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। অন্যদিকে পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালেই দেশে ব্যান্ডউইথ ঘাটতি প্রায় ২০ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।

এ অবস্থায় শুধু বর্তমান চাহিদা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে কর্মশালায়।

বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে প্রত্যাশা

খাতসংশ্লিষ্টরা বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছেন। প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে।

এতে মোট সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে বলে কর্মশালায় জানানো হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

একই সঙ্গে পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

মানসম্মত ইন্টারনেট ও ল্যাটেন্সি কমার সম্ভাবনা

মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সংযোগের ফলে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ কমতে পারে এবং কোয়ালিটি অব সার্ভিস ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ল্যাটেন্সি কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তার মতে, সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি নয়, বরং আইটিসিই তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী।

পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সময়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বিষয়টি শুধু বর্তমানের ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ২০৩০ ও ২০৩৫ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতা কতটা থাকবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

একটি সাবমেরিন ক্যাবলের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই সংকট স্পষ্ট হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সময়মতো চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে।

এই কারণে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে অতীতে সি-মি-উই-৩-এর সুযোগ হারানোর মতো আরেকটি কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতি

বাংলাদেশে ভিডিও স্ট্রিমিং থেকে শুরু করে ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, এআই, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং শিল্প খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এসব সেবার সম্প্রসারণের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদাও বাড়ছে।

তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সংকট মোকাবিলায় নতুন সংযোগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংযোগে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিও কর্মশালায় গুরুত্ব পেয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—বর্তমান প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সংকট: সামনে কী করণীয়

কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য ও পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা আগামী বছরগুলোতে দ্রুত বাড়তে পারে। একই সময়ে বর্তমান অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সি-মি-উই-৪-এর ২০৩০ সালে কার্যকাল শেষ হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে অতিরিক্ত সক্ষমতা, প্রতিযোগিতা এবং তুলনামূলক কম দামের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সংকট শুধু ইন্টারনেটের গতি বা দামের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই বর্তমান চাহিদার পাশাপাশি ২০৩০, ২০৩৫ ও পরবর্তী সময়ের সম্ভাব্য প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ওপর জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সর্বাধিক পঠিত