পর্নোগ্রাফির আড়ালে প্রতারণা নির্যাতন ও অনলাইন বাণিজ্য, পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ৬ অভিযানে ১৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। উঠে এসেছে প্রতারণা, আটকে রেখে ভিডিও ধারণ ও অনলাইন বাণিজ্যের চিত্র।
বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রচার আইনত নিষিদ্ধ। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের সুযোগ নিয়ে গোপনে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরির অভিযোগ সামনে আসছে। সম্প্রতি ঢাকা, নোয়াখালী, বান্দরবান ও গাইবান্ধায় পুলিশের ছয়টি অভিযানে অন্তত ১৬ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রতারণা, আটকে রেখে ভিডিও ধারণ এবং অনলাইনে অর্থ উপার্জনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক। একই সঙ্গে ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের ডিসি তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ডিএমপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ছয় অভিযানে উঠে এসেছে যে চিত্র

সাম্প্রতিক ছয়টি অভিযানের ঘটনায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির পেছনে একাধিক ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও অর্থের বিনিময়ে ভিডিও তৈরির অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবার চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের ডেকে এনে আটকে রাখার পর জোরপূর্বক ভিডিও ধারণের অভিযোগ উঠেছে।
আবার কিছু ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রামভিত্তিক গ্রুপ বা চ্যানেল ব্যবহার করে তৈরি করা কনটেন্ট অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ এবং অনলাইনে প্রকাশ করে আয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু ঘটনায় প্রযুক্তি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং অর্থনৈতিক লেনদেনও যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
আলোচিত গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো
গত ১১ আগস্ট রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার সুমাইয়া সাঈদ ও তাঁর সহযোগী খাজা সাকলাইন ফারুককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও বিক্রির অভিযোগ ওঠে।
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, সুমাইয়া ও ফারুক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রচারের পাশাপাশি টেলিগ্রামভিত্তিক গ্রুপ ও চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে এসব কনটেন্ট সরবরাহ করতেন। নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ‘লাইফটাইম প্যাকেজ’ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে গত ৬ আগস্ট নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের করিমপুর এলাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের দুই ছেলে এবং আরও একজনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, ওই বাসায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির কার্যক্রম চলছিল। অভিযানে চার তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এক তরুণী গোপনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য চান। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এক তরুণীকে পার্লারে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চৌমুহনীতে আনা হয়েছিল। পরে তাঁর মোবাইল ফোন নিয়ে একটি বাসায় আটকে রাখা হয়। এরপর জোরপূর্বক ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সেগুলো অনলাইনে প্রকাশ করে অর্থ উপার্জন করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গাইবান্ধা ও ঢাকার ঘটনাতেও অভিযোগ
গত ৩১ জুলাই রাতে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের একটি ভাড়া বাসায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে দুই নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া দুই নারী ভিডিও ধারণে অংশ নিচ্ছিলেন এবং দুই পুরুষ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছিলেন। অভিযানে পর্নোগ্রাফি তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া গত ২৬ এপ্রিল রাতে রাজধানীর মিরপুরে পর্নোগ্রাফি বিক্রি ও সরবরাহের অভিযোগে জাহিদ হোসেন (২১) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
এর আগে গত বছরের ২০ অক্টোবর বান্দরবান শহরের মধ্যমপাড়া এলাকা থেকে বৃষ্টি ও আজিম নামের এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের অভিযোগ ছিল।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা এবং আন্তর্জাতিক অ্যাডাল্ট ওয়েবসাইটে আপলোডের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে নতুন নির্মাতা নিয়োগের প্রচারের অভিযোগও তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠে।
একই বছরের ৩০ এপ্রিল রাতে রাজধানীর একটি বাসায় ‘ফেমডম সেশন’-এর নামে পুরুষদের শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ ও প্রচারের অভিযোগে শিখা আক্তার (২৫) ও সুইটি আক্তার জারা (২৫) নামের দুই নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ডিজিটাল ফরেনসিকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত
এ ধরনের মামলায় শুধু ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করাই তদন্তের শেষ ধাপ নয়। জব্দ করা মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, কম্পিউটার, রাউটার এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসও গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো ভিডিও বা ছবি কখন তৈরি হয়েছে, কোন ডিভাইসে তা সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং কোথায় পাঠানো হয়েছে—এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অনলাইন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফলে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগের তদন্তে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ ও সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে আইন কী বলছে
বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১২ সালে আইন করা হয়। সরকারি বাংলাদেশ কোডের তালিকাতেও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে কোনো ঘটনায় শুধু পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগই থাকে না; প্রতারণা, জবরদস্তি, আটকে রাখা, শারীরিক নির্যাতন বা মানবপাচারের মতো উপাদান থাকলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনও বিবেচনায় আসতে পারে। ফলে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী তদন্ত ও আইন প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের মামলায় আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ
ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা সম্ভব হলেও অনলাইনে কোনো পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর সেটি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
কোনো মূল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও সরিয়ে ফেললেও অন্য কেউ সেটি ডাউনলোড করে আবার প্রকাশ করতে পারে। ফলে একটি কনটেন্ট একবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে সেটির পুনঃপ্রকাশ ঠেকানো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তাই শুধু কনটেন্ট তৈরির বিষয় নয়, এর সঙ্গে অনলাইন অর্থনীতি, প্রতারণা, জবরদস্তি ও শোষণের অভিযোগও যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে।
নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা
দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক বিস্তার এবং দ্রুত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতার কারণে শুধু ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করে পুরো সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করছে। তাঁর মতে, প্রকৃত অপরাধীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাই গোয়েন্দা নজরদারি ও ডিজিটাল মনিটরিং বাড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
অন্যদিকে ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি, প্রচার, বিজ্ঞাপন, বিক্রি কিংবা এসব অপরাধে সহযোগিতার বিরুদ্ধে ডিএমপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি এ ধরনের অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিরোধে ডিজিটাল সচেতনতার গুরুত্ব
সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো দেখাচ্ছে, অনলাইনভিত্তিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি যেমন ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি তদন্তেও প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার প্রয়োজন বাড়ছে।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, ডিজিটাল সচেতনতা, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং অবৈধ কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
বিশেষ করে চাকরি বা অন্য কোনো সুযোগ দেওয়ার প্রলোভনে কাউকে ডেকে এনে আটকে রাখার মতো অভিযোগগুলো সামনে আসায় প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক ছয়টি অভিযানে অন্তত ১৬ জন গ্রেপ্তারের ঘটনা দেখিয়েছে, পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগের সঙ্গে কোথাও অর্থের লেনদেন, কোথাও প্রতারণা, আবার কোথাও জোরপূর্বক আটকে রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগ যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইনে কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে অপরাধের প্রভাবও সহজে সীমাবদ্ধ রাখা যাচ্ছে না।
তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ, অনলাইন নজরদারি, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং অবৈধ কনটেন্ট অপসারণের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগের সঙ্গে সচেতনতা ও নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিলেই এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতে পারে।





