বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম, যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়ায় ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে যায়, তবে সৌদি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বুধবার কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ার খবর বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবে হামলার পর ইয়ানবু টার্মিনাল থেকে তেল সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম কমার তথ্য জানানো হয়েছে।
বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৮২ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ কমে ১০৪ দশমিক ৮৬ ডলারে নেমে আসে।
এর আগে মঙ্গলবার উভয় ধরনের তেলের দাম ৩ ডলারের বেশি বেড়েছিল। সেই বৃদ্ধির ফলে ১৯ মে-এর পর তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বুধবারের দরপতন তাই আগের দিনের বড় মূল্যবৃদ্ধির পর বাজারে একটি বিপরীতমুখী পরিবর্তন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তেলের দাম কমার প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মজুত

বুধবারের বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। মজুত বাড়ার অর্থ হলো বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হওয়া। এর ফলে আগের দিন সৌদি আরবকে ঘিরে তৈরি হওয়া সরবরাহ উদ্বেগের প্রভাব কিছুটা কমে আসে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত ৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বরং ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল কমার প্রত্যাশা করেছিলেন। এই অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধিই বুধবারের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA) নিয়মিতভাবে দেশটির অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুতের তথ্য প্রকাশ করে। মজুতের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সৌদি আরবে হামলার পরও সরবরাহ উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের মজুত বৃদ্ধির খবরের বিপরীতে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ পরিস্থিতি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু টার্মিনালে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার থেকেই সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা বাড়ে।
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর ইয়ানবু টার্মিনাল থেকে তেল পাঠানো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। এই পাইপলাইন সৌদি আরবের অভ্যন্তর থেকে তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার পর সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল লোডিং স্থগিত করেছিল। একই সঙ্গে ইউরোপে সৌদি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এর ফলে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৩ ডলারের বেশি বেড়ে যায়। কিন্তু বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের মজুত বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশের পর সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
ইউরোপের সরবরাহেও চাপ
সৌদি আরব থেকে ইউরোপে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সৌদি সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হলে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চাপ বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার ইউরোপের কিছু স্পট বা তাৎক্ষণিক সরবরাহের তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলারের ওপরে উঠেছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে বুধবার ফিউচার মার্কেটে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত বৃদ্ধির খবরের পর ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে যায়।
ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দামে পরিবর্তন
বুধবারের বাজারচিত্রে দুই প্রধান আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কেই দরপতন দেখা গেছে।
| তেলের ধরন | বুধবারের দর | কমেছে |
|---|---|---|
| ব্রেন্ট ক্রুড | ১০৭.৮২ ডলার/ব্যারেল | ৯৩ সেন্ট বা ০.৮৬% |
| ডব্লিউটিআই | ১০৪.৮৬ ডলার/ব্যারেল | ৯৭ সেন্ট বা ০.৯২% |
দুই ধরনের তেলের দামই এক শতাংশের কাছাকাছি কমেছে। তবে মঙ্গলবারের ৩ ডলারের বেশি মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় বুধবারের পতন ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এতে বোঝা যায়, বাজারে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি মজুতের কারণে দাম কমার চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো বাজারে রয়েছে।
তেলের বাজারে দুই ধরনের সংকেত
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দুটি বিপরীত সংকেত একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত বেড়েছে, যা বাজারে সরবরাহের চাপ কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরবে তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং ইয়ানবু টার্মিনালে সাময়িক সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঘটনা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই দুই ধরনের পরিস্থিতির প্রভাবেই বুধবার তেলের দাম আগের দিনের তুলনায় কমেছে। তবে সরবরাহসংক্রান্ত ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়েছে—এমন কোনো তথ্য উৎস প্রতিবেদনে নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তেলপ্রবাহ কয়েক দিনের মধ্যে পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে মেরামতের সময় নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কয়েক দিন থেকে পাঁচ-ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সময়ের কথা এসেছে।
বৈশ্বিক সরবরাহের ওপর নজর
সৌদি আরবের সরবরাহ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, আগস্টে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ দৈনিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে, যা তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায় বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়।
তবে বুধবারের বাজারদর নির্ধারণে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত বৃদ্ধির তথ্য বেশি প্রভাব ফেলেছে। ফলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও আগের দিনের মূল্যবৃদ্ধির পর বাজারে কিছুটা সংশোধন দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের পরবর্তী গতিপথ
বুধবারের দরপতন আন্তর্জাতিক তেলবাজারে স্থায়ী নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। কারণ সৌদি আরবের সরবরাহ পরিস্থিতি, ইয়ানবু টার্মিনালের কার্যক্রম এবং যুক্তরাষ্ট্রের মজুত—সবগুলো বিষয়ই বাজারে প্রভাব ফেলছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক তেলবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাজারের উদ্বেগের আরেকটি দিক।
ফলে বুধবার তেলের দাম কমলেও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের পরবর্তী তথ্য এবং সৌদি আরবের তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার অগ্রগতি আন্তর্জাতিক বাজারের পরবর্তী দামের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।





