আরও খবর

Shikor Web Image - 2026-03-01T151104.936
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যে প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে
Shikor Web Image (20)
ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা
Shikor Web Image (17)
দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না সরকার
Shikor Web Image (82)
চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা গুটিয়ে নেব: ডিসিসিআই
Shikor Web Image (80)
থার্ড টার্মিনাল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে: (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার: ১৪ বছরের বিদেশি সফটওয়্যার নির্ভরতার অবসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার নিয়ে ১৪ বছরের বিদেশি সফটওয়্যার নির্ভরতার অবসান, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বাধীকারের বড় পরিবর্তন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সার্বভৌমত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন এবং বিতর্ক এবার নতুন মোড় নিয়েছে। ১৪ বছর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশেষে বিদেশি সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) পরিচালিত কোর ব্যাংকিং সিস্টেম বন্ধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিসিবিআইসিএস (BCBICS)-এ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়—এটি মূলত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আর্থিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের বড় অধ্যায়।

২০১১ সালে টিসিএস সফটওয়্যার চালুর পর ২০২০ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবনের ৩০ তলায় ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের একটি স্থায়ী অফিস ছিল। তারা পেত সার্ভার অপারেশন, ডাটাবেজ অ্যাডমিন পোর্ট, এনক্রিপটেড ফাইল সিস্টেম এবং সিস্টেম পাসওয়ার্ড–লেভেল কনফিগারেশনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অ্যাক্সেস। একটি সার্বভৌম দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে বিদেশি প্রযুক্তিবিদদের এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ বহু বছর ধরে বিতর্ক, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এ কারণে আজকের সিদ্ধান্তকে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন—“এটি আর্থিক খাতে দেশের স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সার্বভৌমত্ব: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

এই সিদ্ধান্তের মূল শক্তি হলো জাতীয় নিরাপত্তা। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সম্পূর্ণ আর্থিক ডাটা, মুদ্রানীতি, রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য—সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিদেশি সফটওয়্যার এত গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল যে এটি “সার্বভৌমত্ব ক্ষয়”-এর অনেক উদাহরণ তৈরি করেছিল।

বহু কর্মকর্তা বলেছেন, “কত তথ্য বাইরে গেছে, কেউ জানে না।”
এই অনিশ্চয়তা থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াই।

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ: ১৪ বছর ধরে কী ঘটেছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা নিয়ন্ত্রণ করতেন—

  • সার্ভার অপারেশন

  • মূল ডাটাবেইস অ্যাডমিন পোর্ট

  • এনক্রিপটেড ফাইল সিস্টেম

  • সিস্টেম-লেভেল পাসওয়ার্ড

এগুলো কেবল প্রযুক্তিগত অ্যাক্সেস ছিল না—এগুলো ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে সংবেদনশীল ডাটার ওপর “টেকনিক্যাল সার্বভৌমত্ব”।

২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির তদন্তেও টিসিএস সিস্টেমের একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতা উঠে আসে। কিন্তু সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রশ্নে তখনকার নীতিনির্ধারকরা অস্বাভাবিক নীরব ছিলেন।

অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট: কেন প্রকল্পটি আটকে ছিল ১৪ বছর?

অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও বিভিন্ন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জানান—

  • বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সক্রিয় লবিং চলত

  • সফটওয়্যার পরিবর্তনের ফাইল দীর্ঘসময় আটকে রাখা হতো

  • লাইসেন্স নবায়নের নামে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নিত একটি মহল

  • প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজ পর্যন্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংক গত দুই দশকে নিজেদের তৈরি ১০০+ সফটওয়্যার ব্যবহার করে। অথচ কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে তারা নিজের সফটওয়্যার প্রয়োগে ব্যর্থ—এ ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের অভিযোগ।

১৪ বছরে বিদেশে গেছে হাজার কোটি টাকা

২০১১–২০২৪ পর্যন্ত টিসিএসকে দেয়া হয়েছে—

  • সার্ভিস চার্জ

  • লাইসেন্স নবায়ন

  • সাপোর্ট ফি

  • বিদেশি পরামর্শকের খরচ

সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিশোধ হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন—

“এই অর্থের বড় অংশ ছিল অদৃশ্য লুটপাটের জানালা।”

বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে আর্থিক স্রোত বাইরে পাঠানোই ছিল মূল লাভজনক লক্ষ্য।

শেষ পর্যন্ত কীভাবে সফল হলো নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সিস্টেম

আইসিটি–১ বিভাগের তরুণ প্রযুক্তিবিদরা এক দশক ধরে ধীরে ধীরে কাজটি এগিয়ে নেন। পরিবর্তনের বিরুদ্ধে থাকা মহলের বাধা থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে তারা—

  • পরীক্ষামূলক অপারেশন শুরু করেন

  • সমান্তরাল রান স্থিতিশীল করেন

  • সব মডিউল সফলভাবে পরীক্ষা করেন

  • নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন করেন

৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটি গ্রিন সিগন্যাল পায়। আর ১৮ ডিসেম্বর টিসিএস সফটওয়্যার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হবে।

অধিকর্তাদের ভাষায়,

“যারা পরিবর্তন আটকাতে চেয়েছিল, তারা এবার ব্যর্থ হয়েছে।”

নতুন সিস্টেম চালুর পর ৫টি বড় পরিবর্তন

১. ডাটা সার্বভৌমত্ব ফিরে আসবে
কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডাটা থাকবে না।

২. বছরে শত কোটি টাকার খরচ কমবে
বিদেশি সাপোর্ট/লাইসেন্স/মেইনটেন্যান্স প্রায় ৭০% কমে যাবে।

৩. সাইবার-ঝুঁকি কমে শূন্যের কোঠায়
নিজস্ব কোড মানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা কাঠামো।

৪. নীতি পরিবর্তন ও কাস্টমাইজেশন দ্রুত হবে
আগে ভারত থেকে অনুমতি নিতে হতো।

৫. রিজার্ভ অ্যাকাউন্টিং ও এএমএল আরও নিরাপদ হবে
২০১৬ সালের মতো ঝুঁকি কমে যাবে।

কারা বাধা দিয়েছিল—প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত

যারা বহু বছর ধরে বিদেশি নির্ভরতাকে টিকিয়ে রেখেছিল তাদের নাম এখনো প্রকাশ হয়নি।
সূত্র জানাচ্ছে—

  • সাবেক কয়েকজন ডেপুটি গভর্নর

  • আইসিটি বিভাগের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা

  • বিদেশি সফটওয়্যার প্রতিনিধি

  • কিছু নীতিনির্ধারক

তদন্ত হলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

 সাইবার সার্বভৌমত্বের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—

  • রাষ্ট্রীয় ডাটা সার্বভৌমত্ব

  • বিদেশি প্রভাব হ্রাস

  • আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিদেশে যাওয়ার পথ বন্ধ

  • ডিজিটাল টাকার রোডম্যাপ আরও শক্তিশালী

  • আর্থিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি

একজন বিশেষজ্ঞ বলেন,

“এটি দেশের আর্থিক স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা।”

১৮ ডিসেম্বর: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা দিবস

টিসিএস সফটওয়্যার বন্ধ হওয়ার পর এটি হবে এক প্রতীকী অর্জন।
ডাটা ভল্টের চাবি আর কেউ পাবে না—এটাই বড় ঘোষণা।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে—
“আমরা আর কাউকে আমাদের ডাটা ভল্টের চাবি দেবো না।”

সর্বাধিক পঠিত