সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে পররাষ্ট্রনীতি গড়তে চায় : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নিয়ে এলো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি’ অনুসরণ করে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। শনিবার অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে তিনি বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দেন এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাও করেন।
হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি চায় যেখানে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও জোর দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান

হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে চায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সমন্বিত কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হলে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ কারণেই সরকার “বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি” বাস্তবায়নের কথা বলছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের নীতির সমালোচনা
সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে হুমায়ুন কবির বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থানেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দোটানায় ছিল।
তার দাবি, ওই সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাঙ্ক্ষিত সম্মান অর্জন করতে পারেনি। হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, “অত্যাচারী এবং অপরাধী হওয়ায় তাদের কাছে তার কোনো সম্মান ছিল না।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পূর্ববর্তী সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং বর্তমান সরকারের ভিন্নধর্মী কৌশলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
চীন-ভারত সম্পর্কের ভারসাম্য প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হুমায়ুন কবির বলেন, আগের সরকার এ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি।
তার মতে, বর্তমান সরকারের সামনে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি জনগণের সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
বিএনপির ম্যান্ডেট প্রসঙ্গ
হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের ম্যান্ডেট বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। এ কারণে সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ভারসাম্য আনার সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে তিনি বিস্তারিত কোনো নীতিগত পরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সেমিনারে নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বার্তা?
বিশ্লেষকদের মতে, “বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি” ধারণাটি মূলত জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি কূটনৈতিক বার্তা। এতে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
একই সঙ্গে তার বক্তব্যে বিগত সরকারের নীতির সমালোচনা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে “বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি” ধারণাটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।




