আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা, ভরি কত?
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
দেশের বাজারে আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (27)
পাঁচ দেশ থেকেই আসে প্রবাসী আয়ের ৬২%, শীর্ষে সৌদি আরব
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
দেশের বাজারে আজ সোনার ভরি কত?
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (15)
দেশের বাজারে আজ সোনার ভরি কত?

হাজার কোটি বিনিয়োগেও কমেনি দুর্ঘটনা, জাহাজভাঙা শিল্প

হাজার কোটি বিনিয়োগেও কমেনি দুর্ঘটনা, জাহাজভাঙা শিল্প , গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হলেও দুর্ঘটনা কমেনি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮ দুর্ঘটনায় ৩ মৃত্যু ও ২৫ শ্রমিক আহত।

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে তুলতে গত ছয় বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন শিল্প মালিক ও উদ্যোক্তারা। তবে বিপুল বিনিয়োগের পরও সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে দুর্ঘটনা ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা কমেনি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিকের মৃত্যু এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন।

গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বাড়ছে বিনিয়োগ

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প খাত হিসেবে জাহাজভাঙা শিল্পে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরোনো জাহাজ পরিবেশসম্মতভাবে ভাঙা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই দেশে গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের প্রচলন শুরু হয়।

একটি ইয়ার্ডকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আকারভেদে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি খরচ করছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে গ্রিন সনদ পাওয়া ইয়ার্ডগুলোর অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

এই বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক ক্রেন, ভারী যন্ত্রপাতি, উন্নত মেঝে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অবকাঠামো উন্নত করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিক নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।

২০২০ সালে শুরু হয় গ্রিন ইয়ার্ডের যাত্রা

পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের প্রচলন শুরু হয়।

২০২৩ সাল পর্যন্ত হংকং কনভেনশনের মানদণ্ড অনুযায়ী মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক গ্রিন ইয়ার্ড সনদ অর্জন করেছিল। তবে ওই বছরের জুনে হংকং কনভেনশনে বাংলাদেশের অনুসমর্থন কার্যকর হওয়ার পর গ্রিন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

বর্তমানে দেশে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডের সংখ্যা ২৫টি। সর্বশেষ গত ১৮ মার্চ সীতাকুণ্ডের উত্তর সলিমপুরের এনবি স্টিল এবং দক্ষিণ শীতলপুরের আরব শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং লিমিটেড গ্রিন সনদ অর্জন করে।

আরব শিপব্রেকিংয়ের চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন রুবেল জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ইয়ার্ডের অবকাঠামো খাতে ৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানে নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার

জাহাজ পুনর্ব্যবহারকে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত করার লক্ষ্যেই হংকং কনভেনশন তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) অনুযায়ী, এই কনভেনশন জাহাজ পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় মানবস্বাস্থ্য, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর জন্য নিয়ম নির্ধারণ করে।

বিপুল বিনিয়োগের পরও দুর্ঘটনা কমেনি

অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও শ্রমিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং বিলসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনা বেড়েছে।

এই সময় ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের অদক্ষতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করা এবং নিরাপত্তা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিলসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটেছে ওপর থেকে গার্ডার বা অন্যান্য ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেনের হুক খুলে যাওয়া এবং গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে যেসব শ্রমিক

জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করা সব শ্রমিকের ঝুঁকি সমান নয়। প্রতিবেদনে কাটারম্যান, কাটার ও ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান এবং লোডিং গ্রুপের শ্রমিকদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে বিলস। এর মধ্যে রয়েছে অনিরাপদ আচরণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি, তদারকির অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা।

অর্থাৎ, শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি বা উন্নত অবকাঠামো তৈরি করলেই শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার, নিয়মিত তদারকি এবং কর্মপরিবেশের নিরাপত্তাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দেড় দশকে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু

বিলসের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে ২ শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক শ্রমিক।

বছরভিত্তিক তথ্যেও দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। ২০২৩ সালে ৩৪টি দুর্ঘটনায় সাতজন শ্রমিক মারা যান এবং ২৮ জন আহত হন। ২০২৪ সালে ২৮টি দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু ও ৩৬ জন আহত হন।

২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বেড়ে ৪৮টিতে দাঁড়ায়। ওই বছর চারজন শ্রমিক মারা যান এবং ৫৮ জন আহত হন।

এ ছাড়া ২০২০ সালে ১০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন এবং ২০১৬ সালে ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তায় জোর দেওয়ার প্রশ্ন

জাহাজভাঙা শিল্পে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা—এই দুইয়ের মধ্যে এখনও একটি ব্যবধান রয়েছে।

একদিকে আধুনিক ক্রেন, ভারী যন্ত্রপাতি, উন্নত ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, নিরাপত্তা তদারকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।

ফলে গ্রিন সনদ অর্জনের পাশাপাশি সনদের নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেন দুর্ঘটনা, গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ডের মতো ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা প্রয়োজন বলে তথ্যগুলো ইঙ্গিত করছে।

শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শ্রমিক নিরাপত্তার ওপর

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশগত মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

গত ছয় বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও যদি দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়—নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ, প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং কর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহারেও আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ছে, বিনিয়োগও বাড়ছে। এখন সেই বিনিয়োগের সুফল শ্রমিকের নিরাপত্তায় কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে গ্রিন ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল বিনিয়োগ হলেও দুর্ঘটনা ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এখনও উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনা এবং গত দেড় দশকে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য দেখাচ্ছে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত