টাকা ছাপাতে এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্টে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয় ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, আগের বছরের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অডিটরস রিপোর্ট ও অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টস অনুযায়ী, নোট মুদ্রণে ব্যয় এক বছরে বেড়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে নোট মুদ্রণে মোট ব্যয় হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় ছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও মুখপাত্র এবং নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষায়িত কাগজ ও কালির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার কারণে নোট মুদ্রণের ব্যয় বেড়েছে। নোটের নকশা পরিবর্তনকে ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন না তিনি।
নোট মুদ্রণে ব্যয় কেন এতটা বাড়ল
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুরনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোট তুলে নিয়ে তার পরিবর্তে নতুন নোট ছাপানো। এই প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা কাগজ, বিশেষ ধরনের কালি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
এসব উপকরণ সাধারণ বাজারের প্রচলিত পণ্য নয়। এগুলো বিশেষায়িত এবং আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। ফলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত থাকে। এ কারণে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দর-কষাকষির সুযোগও তুলনামূলকভাবে কম বলে জানিয়েছেন আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেন, টাকা ছাপানোর কাগজ ও কালি বিশেষায়িত হওয়ায় এসব উপকরণের সরবরাহকারী সীমিত। তাই দাম নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ কম। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে কাগজের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যাও এবার ব্যয় বাড়িয়েছে।
পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ নোট মুদ্রণ ব্যয়

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক অর্থবছরেও নোট মুদ্রণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ব্যয় গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অর্থবছরভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব হলো—
- ২০২৫-২৬: ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা
- ২০২৪-২৫: ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা
- ২০২৩-২৪: ৩৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা
- ২০২২-২৩: ৩৭৪ কোটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা
- ২০২১-২২: ৩৮৪ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা
এই হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যয় ২০২৩-২৪, ২০২২-২৩ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের হিসাবকেও ছাড়িয়ে গেছে।
নোট ছাপানোর কাজে এসপিসিবিএলের ভূমিকা
বাংলাদেশে নোট মুদ্রণের কাজ করে দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড (এসপিসিবিএল)। নোট মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণ বিশেষায়িত এবং আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়।
পুরনো বা ব্যবহারের অনুপযোগী নোট তুলে নেওয়ার পর তার পরিবর্তে নতুন নোট সরবরাহ করা হয়। ফলে দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নিয়মিতভাবেই নতুন নোট মুদ্রণের প্রয়োজন হয়।
এই ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয় শুধু নোট ছাপানোর কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত উপকরণের বাজারদরও সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে এবারের ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাগজ ও কালির মূল্য বৃদ্ধিকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র।
নোট মুদ্রণে ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ কী
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান নোট মুদ্রণে ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, নোট তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ ও কালি বিশেষ ধরনের হওয়ায় এগুলোর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সীমিত। ফলে এসব উপকরণের মূল্য নিয়ে বড় ধরনের দর-কষাকষির সুযোগ থাকে না।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিকভাবে কাগজের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধি নোট মুদ্রণের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের খরচেও প্রভাব ফেলেছে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বা সাপ্লাই চেইনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিশেষায়িত উপকরণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতিও ব্যয় বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ফলে একদিকে উপকরণের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে সীমিত সরবরাহকারী এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন নকশার নোট কি ব্যয় বাড়িয়েছে?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি থাকা নোটের পরিবর্তে নতুন নকশার নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের নকশা পরিবর্তনের কাজ চলছে।
তবে নতুন নকশার কারণে নোট মুদ্রণের ব্যয় বেড়েছে—এমনটি মনে করেন না আরিফ হোসেন খান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নকশা পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয় খুবই কম।
তিনি মূলত নোট তৈরির কাগজ ও কালির দাম বৃদ্ধিকেই ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ নতুন নকশার পরিবর্তনের চেয়ে মুদ্রণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবই এবারের ব্যয়ের ওপর বেশি পড়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আগের অর্থবছরের তুলনায় বড় পরিবর্তন
২০২৪-২৫ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় ছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এক বছর পর সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায়।
অর্থাৎ মাত্র এক অর্থবছরের ব্যবধানে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সুনির্দিষ্ট হিসাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ৩৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যয় ছিল ৩৭৪ কোটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৮৪ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
তাই গত পাঁচ অর্থবছরের হিসাব বিবেচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ব্যয়ই সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে
নোট মুদ্রণে ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অডিটরস রিপোর্ট ও অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টসে পাওয়া গেছে।
আরও তথ্যের জন্য নোট মুদ্রণে ব্যয়-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য দেখা যেতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা বেশি। গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যেও এটি সর্বোচ্চ ব্যয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বক্তব্য অনুযায়ী, কাগজ ও কালির মূল্যবৃদ্ধি, সীমিত সরবরাহকারী এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সমস্যাই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ। অন্যদিকে নতুন নকশার নোট চালুর কারণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করেন না তিনি।





