আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (24)
গ্যাস-সংকটের প্রভাব- বাজারে আটা-চিনির সরবরাহে টান, বেড়েছে দাম
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (21)
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে গুনতে হবে নতুন চার্জ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
দেশের বাজারে আজ সোনার ভরি কত?
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের ৫৭টির সরবরাহ বন্ধ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (9)
দাম বাড়ার পর আজ সোনার ভরি কত

জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ, পরিশোধ সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি

জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ ছাড়িয়েছে। পরিশোধ হয়েছে ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি। নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় মাস শেষে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মানি মার্কেট ডিনামিকস’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাবাজার, সুদের হার ও তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ঋণ নেওয়া ও পরিশোধ—দুই ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে।

ট্রেজারি বিল থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ

জুলাইয়ে সরকারি ট্রেজারি বিলের চারটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এসব নিলামের মাধ্যমে সরকার ৪৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়।

আগের মাসের তুলনায় ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে জুলাইয়ের ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সরকার ৩৯ হাজার কোটি টাকার ট্রেজারি বিল পরিশোধ করেছে।

ফলে ট্রেজারি বিলের হিসাবে জুলাইয়ে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা।

ট্রেজারি বিলের সুদহারও বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ট্রেজারি বিলের ইল্ড বা সুদহারও বেড়েছে।

৫ জুলাই ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মাসের শেষ দিকে, ২৬ জুলাই তা বেড়ে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশে পৌঁছায়। এই মেয়াদের বিলের মাধ্যমে জুলাইয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড মাসের শুরুতে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ থাকলেও মাস শেষে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ১০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে ওঠে।

ট্রেজারি বন্ডে নিট ঋণ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা

জুলাইয়ে দুই থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের তিনটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এসব নিলামের মাধ্যমে সরকার ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়।

একই সময়ে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড পরিশোধ করা হয়। ফলে জুলাইয়ে ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, ট্রেজারি বিল ও বন্ড—দুই উৎস মিলিয়ে মাসটিতে সরকারের মোট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রায় ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় নিট ঋণ হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

ঋণনির্ভরতা বাড়ার কারণ কী?

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। তাঁদের আশঙ্কা, ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতও ঋণের ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। তবে এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়টি সরকারকেই বিবেচনা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে।

চলতি অর্থবছরে ঋণের লক্ষ্য ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪ শতাংশের বেশি। বিপরীতে একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।

সুদ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

সাবেক অর্থসচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, সরকারের আয়ের সক্ষমতার তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি। এ কারণে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বেশি থাকায় সরকারের ঋণ ব্যয়ও বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যয় কমানো এবং আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি যখন তুলনামূলকভাবে কম, তখন সরকারি ঋণের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ব্যাংক খাতের অর্থায়ন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

সরকারের মোট ঋণ কোথায় যেতে পারে

অর্থ বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।

প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ আরও বেড়ে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হতে পারে।

ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। দুই বছর পর এই ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

জুলাইয়ে সরকারের ব্যাংক ঋণ: অর্থনীতিতে কী বার্তা

জুলাইয়ের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, সরকার একদিকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে, অন্যদিকে একই মাসে প্রায় সমপরিমাণ ঋণ পরিশোধও করেছে। ফলে মোট ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হলেও নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তবে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আদায়ের কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক কম হওয়ায় অর্থনীতিতে ঋণের বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য সরকারি অর্থব্যবস্থায় ঋণের বড় ভূমিকা তুলে ধরেছে। একই সময়ে ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তবে রাজস্ব আদায়, ঋণের সুদহার এবং ভবিষ্যৎ সুদ ব্যয়ের প্রক্ষেপণ—সব মিলিয়ে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, আয় বাড়ানো এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঋণের ব্যয়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

সর্বাধিক পঠিত