আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই কি খুন হতে হলো লিমনকে। রুমমেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি অনুসন্ধান ও দুই হত্যার অভিযোগে উঠে এসেছে ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন হত্যাকাণ্ডে নতুন তথ্য সামনে আসায় লিমন হত্যাকাণ্ড রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ দাবি করেছেন, খুনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে লিমন তাঁর রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবস্থাপনার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিলেন। একই সময়ে আদালতে জমা নথিতে সন্দেহভাজনের চ্যাটজিপিটি অনুসন্ধান, ছুরিকাঘাতের আলামত এবং তদন্তকারীদের নতুন তথ্য প্রশ্ন তুলছে—অভিযোগের কারণেই কি প্রাণ হারাতে হলো লিমনকে?
অভিযোগের পর কি বাড়ে ঝুঁকি?
জুবায়ের আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাস আগে লিমন ওই অ্যাপার্টমেন্টে ওঠেন। পরিবারের সঙ্গে আলাপে তিনি প্রায়ই রুমমেট আবুঘরবেহকে বিরক্তিকর, অসামাজিক ও সমস্যাসংকুল ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করতেন।
জুবায়ের সিএনএনকে বলেন, তাঁর জানা মতে, লিমন খুন হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে আবাসিক কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন। এই দাবি যাচাইয়ে সিএনএন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর লিমন হত্যাকাণ্ড রহস্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অভিযোগ ও হত্যার সময়সীমার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে এখন জোর আলোচনা চলছে।
হিশাম আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে তদন্তে কী মিলছে
আদালতে তদন্তকারীদের জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—কাউকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ফেলে দিলে কী ঘটতে পারে।
এই অনুসন্ধান এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
গত শুক্রবার মার্কিন নাগরিক আবুঘরবেহকে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ফার্স্ট ডিগ্রি হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে একটি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও উল্লেখ আছে।
লিমনের মরদেহ উদ্ধারে যে তথ্য মিলেছে

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের পর ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কালো আবর্জনার ব্যাগে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আদালতের নথিতে বলা হয়, মরদেহে কোনো পোশাক ছিল না এবং একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
মেডিক্যাল এক্সামিনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিঠের নিচের অংশে গভীর ছুরিকাঘাত লিভার ভেদ করে যায়। শরীরের আরও বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে মৃত্যুকে আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যাকাণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
লিমন হত্যাকাণ্ড রহস্যে বৃষ্টির অনিশ্চিত পরিণতি
১৬ এপ্রিল ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। পরদিন তাঁদের এক বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান।
তবে এখনো বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার হয়নি।
যেখানে লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়, তার কিছু দূরের একটি জলাশয় থেকে গত রোববার একটি খণ্ডিত দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। সেটি বৃষ্টির কি না, তা পরীক্ষা চলছে।
এই অনিশ্চয়তা মামলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তদন্তকারীরা কেন ড্যাশক্যাম ফুটেজ চাইছেন
তদন্ত কর্মকর্তারা ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ অতিক্রম করা ব্যক্তিগত গাড়ির ড্যাশক্যাম ভিডিও খুঁজছেন।
শেরিফের কার্যালয় ফেসবুক পোস্টে এ আহ্বান জানিয়েছে। পোস্টে অনুসন্ধান অভিযানের ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এসব ফুটেজ থেকে গুরুত্বপূর্ণ গতিবিধি শনাক্ত হতে পারে।
আদালতে প্রসিকিউশনের অবস্থান
আদালতে জমা আবেদনে তদন্তকারীরা বলেছেন, হত্যার নির্মম ও সহিংস প্রকৃতি অভিযুক্তকে মুক্তি দিলে জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাদের ভাষ্যে, কোনো শর্তসাপেক্ষ মুক্তিও এলাকাবাসীকে যুক্তিসঙ্গতভাবে নিরাপদ রাখতে পারবে না।
মঙ্গলবার ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহর স্ট্যাটাস হিয়ারিং হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে নির্ধারিত প্রিট্রায়াল ডিটেনশন শুনানি স্থগিত করা হয়।
অভিযোগ ও হত্যার যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন
এখন মূল প্রশ্ন—রুমমেটের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ কি হত্যার মোটিভ হয়ে উঠেছিল?
তদন্ত এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে অভিযোগের সময়, চ্যাটজিপিটি অনুসন্ধান, মরদেহ গোপনের অভিযোগ এবং পরবর্তী গ্রেপ্তার—সবকিছু মিলে লিমন হত্যাকাণ্ড রহস্য মামলাকে জটিল ও আলোচিত করে তুলেছে।
বিশেষ করে পরিবারের বক্তব্য ও তদন্ত নথির মিল-অমিল এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় মামলা
এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশি প্রবাসী শিক্ষার্থী সমাজেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পাস নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্যাম্পাসের বাইরে বাসাভাড়া নিয়ে নতুন আতঙ্কের কথাও সামনে এসেছে।




