মেক্সিকো বিশ্বকাপ নিরাপত্তা নিয়ে সহিংসতার মধ্যেও আশাবাদী ফিফা সভাপতি। ৭৪ জন নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ থাকলেও সফল আয়োজনের শক্ত বার্তা দিয়েছেন তিনি।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FIFA-এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার পরও মেক্সিকো বিশ্বকাপ নিরাপত্তা নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশ্বস্ত। মঙ্গলবার ফরাসি বার্তা সংস্থা AFP-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন সফলভাবেই সম্পন্ন হবে।
কলম্বিয়ার বারানকুইলা শহরে এক অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো বলেন, “আমি খুবই আশ্বস্ত। সব কিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিশ্বকাপ দুর্দান্ত সফল হতে যাচ্ছে।”
এই মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন মাদক কার্টেল প্রধানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মেক্সিকো-জুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপ আয়োজন
২০২৬ সালের ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে যৌথভাবে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাশাপাশি মেক্সিকো এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান আয়োজক।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আয়োজক শহরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে মাদক কার্টেল প্রধান নেমেসিও ‘এল মেঞ্চো’ ওসেগুয়েরা সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত হওয়ার পর তার অনুসারীরা দেশজুড়ে সহিংস কর্মকাণ্ড চালায়।
এই ঘটনার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনের জন্য দেশটি কতটা প্রস্তুত? কিন্তু ইনফান্তিনোর বক্তব্যে আশাবাদী বার্তাই উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, বড় কোনো আয়োজনের আগে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ থাকলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা মোকাবিলায় সক্ষম।
মেক্সিকো বিশ্বকাপ নিরাপত্তা নিয়ে ফিফার মূল্যায়ন

ফিফা সভাপতির মতে, আয়োজক দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত এবং বিশ্বকাপের আগে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। তারা দর্শক, খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিফার এই অবস্থান আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে শুধু খেলাধুলা নয়, পর্যটন, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তিও জড়িত।
সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা
মেক্সিকো সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর অভিযানের পর সংঘর্ষ ও সহিংসতায় অন্তত ৭৪ জন নিহত হন।
দেশটির ৩২টি রাজ্যের মধ্যে ২০টিতে কার্টেল সদস্যরা রাস্তা অবরোধ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন যানবাহন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বকাপ শুরু হতে মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকায় নিরাপত্তা প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
আয়োজক শহরগুলোর চ্যালেঞ্জ
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে গুয়াদালাহারা শহর। এটি জলিস্কো রাজ্যের রাজধানী এবং গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচের ভেন্যু।
এই শহরে উরুগুয়ে বনাম স্পেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া মার্চের শেষে প্লে-অফ টুর্নামেন্টও এখানে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে শেষ দুটি দল বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ম্যাচ ও আন্তর্জাতিক দর্শকদের উপস্থিতির কারণে শহরটির নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
সরকারের আশ্বাস
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম আগেই জানিয়েছেন, বিদেশি দর্শকদের জন্য কোনো ঝুঁকি নেই।
তিনি বলেন, “দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আয়োজক শহরগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও কূটনৈতিক গুরুত্ব
বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু ক্রীড়া নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতা তুলে ধরতে চায়।
মেক্সিকোর জন্য এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কার্টেল সহিংসতার জন্য আলোচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, সফলভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারলে দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে।
অর্থনীতি ও পর্যটনে সম্ভাবনা
বিশ্বকাপ আয়োজনে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশা করছে মেক্সিকো।
পর্যটন, হোটেল, পরিবহন ও ব্যবসা খাতে বড় বিনিয়োগ আসবে।
সরকার মনে করছে, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে এনে সফল আয়োজন করতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে।
নিরাপত্তা পরিকল্পনার অগ্রগতি
আয়োজক দেশগুলো যৌথভাবে নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করছে।
বিশেষ করে সীমান্ত, বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম ও পর্যটন এলাকাগুলোতে কঠোর নজরদারি থাকবে।
ফিফা, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আস্থার বার্তা
সব ধরনের উদ্বেগ সত্ত্বেও ফিফা সভাপতি মনে করেন, এই বিশ্বকাপ নতুন ইতিহাস তৈরি করবে।
তিনি জানান, আয়োজন সফল হলে উত্তর আমেরিকার ফুটবল উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করলেও ফিফা এবং মেক্সিকো সরকার উভয়ই আশাবাদী।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখন নজর রয়েছে—আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিশ্বকাপের আগে দেশটি কতটা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।




