সাবেক উপদেষ্টাদের সরকারি বাসভবন ছাড়ার ‘অনীহা’ তৈরি হয়েছে মব সহিংসতার আতঙ্কে। ২৪টি বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়েও আছে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা বর্তমানে সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে ‘অনীহা’ প্রকাশ করছেন। বিষয়টি জানা গেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে। তারা মূলত মব সহিংসতা ও জনরোষের আশঙ্কায় নিরাপদ পরিবেশে থাকার চেষ্টা করছেন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা বারবার নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
নাগরিকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে মানবাধিকার বিষয়ক এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে। তবে ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানবাধিকার চিত্র সেই আশার সাথে মেলেনি।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন
মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানামুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে মব সহিংসতা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রেপ্তার এবং বিচারবিহীন আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ও হেফাজতে থাকা অবস্থায় ১৭ মাসে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জনের; এর মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিও রয়েছেন।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির চিত্র
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনি নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ ছিল। এইচআরএসএস ও এইচআরডব্লিউয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে ৪১৩টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনা দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকে প্রমাণ করে।
সাবেক উপদেষ্টাদের ‘অনীহা’
বর্তমানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা মনে করছেন, তারা জনরোষের শিকার হতে পারেন। এই আতঙ্কে তারা সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধা প্রকাশ করছেন। তবে নিরাপত্তার কারণে তারা আপাতত সরকারি বাসভবনে থাকছেন।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও তাদের দীর্ঘ সময় সেখানে রাখতে চাচ্ছে না। চলতি মাসের মধ্যেই তাদের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ অসুবিধা থাকলে সর্বোচ্চ এক থেকে দুই মাস সময় দেওয়া হবে। মার্চ বা এপ্রিল মাসে কেউ সরকারি বাসা ব্যবহার করলে সরকার নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
সাবেক এক উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন হিংসা ও ভাঙচুরের ঘটনা, গণপিটুনি, মামলা ও গ্রেপ্তার, মাজার ভাঙচুর এবং সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগের কারণে জনগণের ক্ষোভ রয়েছে। এসব কারণে সাবেক সরকারের প্রতি জনরোষের আশঙ্কা রয়েছে।”
সরকারি নির্দেশনা ও বাসা বরাদ্দ
আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “সাবেক উপদেষ্টাদের জন্য কোনো পেনশন সুবিধা নেই। তাই তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। আশা করা যায়, তারা চলতি মাসের মধ্যে বাসা ছাড়বেন। বিশেষ প্রয়োজন হলে এক মাসের সময় দেওয়া হবে, ভাড়া আদায় করা হবে।”
তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চলতি ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছেড়ে তার গুলশানের বাসভবনে উঠবেন।
তাহারেক রহমান সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জন্য মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডে ২৪টি বাংলো এবং ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতাদের জন্যও আলাদা একটি বাসভবন আছে। এগুলো মেরামত করে নতুন সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীদের বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।
বাসা বরাদ্দ প্রক্রিয়া
বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ৪৯ জন। এছাড়া উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী রয়েছেন ১০ জন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা বরাদ্দ রাখা হবে। আবাসন পরিদপ্তর চেষ্টা করছে সবাইকে বাসা বরাদ্দ দিতে।
মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার ২১ জন আবেদন করেছেন। কাকে কোন বাসা দেওয়া হবে, তা মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম ও আবাসন পরিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে নির্ধারণ করেছেন। আবেদনকারীদের সরেজমিন পরিদর্শন করে মন্ত্রীর দপ্তরে জানাতে বলা হয়েছে।




