পে স্কেলে বছরে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে চলতি অর্থবছরের বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উপায় খুঁজতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৩১ আগস্ট এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ নির্দেশ দেন বলে বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আদায়ে জোর

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। সোর্স নিউজ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর কারণে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এই অর্থের জোগান দিতে এনবিআরকে চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কার্যকর উপায় খুঁজতে বলা হয়েছে। বৈঠকে উপদেষ্টা যেকোনো মূল্যে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে টিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআরের একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, তা জোগানের দায়িত্বও এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ, আগের অর্থবছরের তুলনায় এবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর দেশে রাজস্ব আদায়ে ২৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির রেকর্ড নেই। সেই বিবেচনায় এবারের প্রায় ৪৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধিকে অত্যন্ত কঠিন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কেন রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে
এনবিআর কর্মকর্তারা চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কয়েকটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, অর্থনীতির মন্থর গতি রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বাধা তৈরি করছে। শিল্প উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা এবং আমদানি কমে যাওয়াও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষ করে আমদানি শুল্কনির্ভর রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে এনবিআরকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সম্পর্ক
সরকারের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে যে পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় হবে, সেটিই রাজস্ব আদায়ের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বৈঠকে উঠে এসেছে।
নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের জন্য সরকারের ব্যয় বাড়বে। সোর্স অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা সরাসরি পাবেন ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী।
ফলে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। সেই অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে বড় চ্যালেঞ্জ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি করছে।
অর্থাৎ, শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই তা অর্জন করা সহজ হবে না। অর্থনীতির গতি, শিল্প উৎপাদন, আমদানি এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোও এর সঙ্গে যুক্ত।
নতুন পে স্কেলে সরাসরি উপকৃত হবেন ৩৩ লাখ মানুষ
সরকার সোমবার নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে। এতে ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন।
সব মিলিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন ৩৩ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী। তবে এই কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এ কারণেই এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের সামনে কঠিন বাস্তবতা
এনবিআরের সামনে চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। আগের অর্থবছরের ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার তুলনায় এই লক্ষ্য প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে স্বাধীনতার পর রাজস্ব আদায়ে ২৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির রেকর্ড নেই। ফলে বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, অর্থনীতির মন্থর গতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদনে বাধা এবং আমদানি কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বিশেষ করে আমদানি শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায় কমে গেলে সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চাপ বাড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে সামনে কী চ্যালেঞ্জ
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি ব্যয় বাড়ছে। একই সময়ে সেই অতিরিক্ত অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও বড় করা হয়েছে।
এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা থাকা অবস্থায় কীভাবে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এনবিআর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এ বিষয়টির কঠিন বাস্তবতা উঠে এসেছে।
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুনও এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে লক্ষ্যমাত্রাটি অর্জন কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন।
ফলে নতুন পে স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় সামলাতে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়
নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের জন্য সরাসরি আর্থিক সুবিধা তৈরি করবে। তবে এর বিপরীতে সরকারের বার্ষিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সোর্স নিউজে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থের সংস্থান করতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারের জন্য একদিকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহের বড় লক্ষ্য পূরণ—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে এনবিআরকে চলতি অর্থবছরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উপায় খুঁজতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতির মন্থর গতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শিল্প উৎপাদনে বাধা এবং আমদানি কমে যাওয়ার কারণে লক্ষ্যমাত্রাটি অর্জন কঠিন হতে পারে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। একইভাবে সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুনও বর্তমান পরিস্থিতিতে এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ জোগান দেওয়ার সক্ষমতা এখন সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।





