একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিস্ফোরক অভিযোগ, যা বঙ্গভবনের সাংবাদিক ব্যবস্থা প্রভাবিত করেছে।
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত শুক্রবার রাতে কালের কণ্ঠকে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, বঙ্গভবনের প্রেস উইং তার প্রেসিডেন্সিয়াল দায়িত্বে প্রভাবিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিবের আক্রোশের কারণে পুরো প্রেস উইং কার্যত অচল হয়ে গেছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, এই ঘটনার সূত্রপাত ছিল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে বিজয়ী নবনির্বাচিত কমিটির সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ থেকে। রাষ্ট্রপতি বলেন, “সাক্ষাৎটি ছিল সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা এবং একটি ফটোসেশনের মাধ্যমে শেষ। কোনো বিরাট অনুষ্ঠান বা রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না।”
কিন্তু পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় সেই সাক্ষাতের খবর ছবিসহ প্রকাশিত হলে প্রেস উইং বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। রাষ্ট্রপতি জানান, এরপর গোটা বঙ্গভবনের প্রেস উইংয়ের সদস্যদের খুঁজতে শুরু হয়, যদিও বাস্তবে কোনো কর্মী এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। রাষ্ট্রপতি নিজে সাংবাদিকদের চিঠি পাওয়ার পর তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
প্রেস উইং কার্যত অচল: রাষ্ট্রপতির অভিযোগ

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন, তিনজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা—প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারি—একযোগে প্রত্যাহার করা হয়। তাছাড়া, দীর্ঘ ৩০ বছর দায়িত্বে থাকা দুইজন ফটোগ্রাফারকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে বঙ্গভবনের পুরো প্রেস উইং কার্যত ভেঙে যায়।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, “জাতীয় ক্রিকেট দল কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিতলেও রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সাধারণ অভিনন্দন বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যায় না। পরিস্থিতি পুরোপুরি প্রতিবন্ধী করে দেওয়া হয়েছে।”
রাষ্ট্রপতির প্রচেষ্টা ব্যর্থ: প্রশাসনিক উদাসীনতা
রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, তিনি একাধিকবার ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এবং এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন প্রেস উইং সচল করার জন্য, কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। তার মতে, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জনগণের কাছে তার উপস্থিতি বা এক্সপোজার সীমিত করার উদ্দেশ্যে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, “দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসগুলোতে যে রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়, সেখানে আমার ছবি ও বাণী প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত দেড় বছরে আমার কোনো বাণী রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।”
রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং সংকট: সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানিক পদ। বঙ্গভবন কেবল আনুষ্ঠানিক বাসভবন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এই কারণে রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং রাষ্ট্র পরিচালনার যোগাযোগ কাঠামোর অপরিহার্য অংশ।
রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল অনুসারে প্রেস উইংয়ের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, বাণী, শুভেচ্ছা ও অবস্থান জনগণ ও গণমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রেস উইং স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং সরকারপ্রধানের দপ্তর থেকে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় থাকে।
রাষ্ট্রীয় প্রথার বিপর্যয়
রাষ্ট্রপতির ছবি, বাণী ও বক্তব্য রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্র, জাতীয় দিবসের প্রকাশনা এবং সরকারি যোগাযোগে অন্তর্ভুক্ত থাকা দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। এটি রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতীকী ধারাবাহিকতার অংশ। এই রেওয়াজ থেকে বিচ্যুতি রাষ্ট্রীয় প্রথা ও সাংবিধানিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন।




