এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (22)
শিক্ষকদের পে স্কেল বাস্তবায়নে নতুন নির্দেশনা, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিঠি
News Photocard (16)
পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬১৫ কোটি ডলারের বেশি নিয়ে গেছে বিদেশি কম্পানি
News Photocard (13)
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিন কমিটি বিলুপ্ত, ১৪ নেতা বহিষ্কার
News Photocard (7)
প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফরের কর্মসূচিতে যা রয়েছে
News Photocard
৭ দেশের শ্রমবাজারে ৯৪ শতাংশ বাংলাদেশি

ভিসা বাণিজ্যে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার অঘোষিত লেনদেন

ভিসা বাণিজ্যে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার অঘোষিত লেনদেন, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালাল কমিশন ও ভিসা কেনাবেচার চিত্র দেখুন।

বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশকে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিসা কেনাবেচা, মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন ও বিভিন্ন পর্যায়ের অননুমোদিত লেনদেন মিলিয়ে বছরে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকার অঘোষিত লেনদেন হচ্ছে।

এই ভিসা বাণিজ্যে অঘোষিত লেনদেন শুধু বিদেশে যাওয়ার খরচ বাড়াচ্ছে না, অনেক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপও তৈরি করছে। বিদেশ যাওয়ার আগে অনেক কর্মী জানেন না তাঁরা কোন প্রতিষ্ঠানে কী কাজ করবেন, বেতন কত হবে কিংবা চাকরির শর্ত কী।

কখনো নিয়োগকর্তার প্রকৃত চুক্তিপত্রও তাঁদের হাতে থাকে না। চুক্তিপত্র পেলেও বিদেশে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, সেখানে উল্লেখ করা কাজ, বেতন বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

তৈয়ব আলীর অভিজ্ঞতায় অভিবাসন ব্যয়ের ঝুঁকি

এক প্রতিবেদনে বণিক বার্তা নোয়াখালীর তৈয়ব আলীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। সৌদি আরব যেতে তাঁর খরচ হয়েছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ছিল ঋণের অর্থ। বাকি টাকা তিনি গরু ও স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে সংগ্রহ করেছিলেন।

তাঁকে প্যাকেজিংয়ের কাজ দেওয়ার কথা বলা হলেও সৌদি আরবে গিয়ে প্রায় দুই মাস কোনো কাজ পাননি। পরে একটি কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী কাজ পেলেও নিয়মিত বেতন পাননি। শেষ পর্যন্ত ছয় মাসের মধ্যে তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হয়।

এই ঘটনা দেখায়, বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মসংস্থানের বাস্তবতা ও চুক্তির নিশ্চয়তা না থাকলে একজন কর্মী কী ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

বিএমইটির হিসাব বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে শীর্ষ ১০টি দেশে গেছেন ১০ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৪ জন।

সরকার নির্ধারিত হারে এসব কর্মীর অভিবাসন ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পাওয়া সর্বনিম্ন ব্যয়ের হিসাবও দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি।

অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত ব্যয় এবং মাঠপর্যায়ের সর্বনিম্ন ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এই বড় ব্যবধানই বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিদ্যমান ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিএমইটির সরকারি প্রকাশনায় নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্য সংগ্রহ এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও সিঙ্গাপুরে ব্যয়ের চিত্র

মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে একজন কর্মীর চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।

সৌদি আরবে যেতে গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে একজন কর্মীর বিদেশযাত্রার খরচ ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।

সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের সঙ্গে এসব বাস্তব খরচের বড় পার্থক্যের পেছনে ভিসা কেনাবেচা, রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্ট ও দালালদের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিশনের বিষয়টি সামনে এসেছে।

ভিসা বাণিজ্যে অঘোষিত লেনদেনের বড় অংশ যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের মোট অভিবাসন ব্যয়ের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ যায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের হাতে।

আরও ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ যায় রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে। সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে যায় মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, বিদেশে যাওয়ার মোট ব্যয়ের বড় অংশই আনুষ্ঠানিক সরকারি ফি হিসেবে পরিশোধ হচ্ছে না। বরং মধ্যস্থতাকারী ও রিক্রুটিং ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অর্থের বড় অংশ চলে যাচ্ছে।

সৌদি আরবে কর্মী সরবরাহকারী বাংলাদেশি এজেন্ট জাকারিয়া সিকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি কাজের অনুমতিপত্র সৌদি আরবে প্রায় দুই লাখ টাকায় পৌঁছায়। এরপর বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্ট ও দালালের মাধ্যমে সেটি কয়েক দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি পর্যায়ে কমিশন যোগ হওয়ায় প্রাথমিক খরচের তুলনায় ভিসার দাম তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

ভিসা কেনাবেচায় হুন্ডির ব্যবহার

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে শুধু ভিসা কেনার জন্য আনুমানিক ৫ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।

পরে এসব ভিসা কর্মীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ১৬ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ ভিসা কেনাবেচার ক্ষেত্রে শুধু কর্মীর বিদেশযাত্রার খরচই নয়, অর্থ স্থানান্তরের অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।

কাজ ও বেতনের নিশ্চয়তা না থাকায় বাড়ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি নিয়োগকর্তার প্রকৃত চাহিদা, কাজের ধরন এবং বেতনের নিশ্চয়তা না থাকা ভিসা কেনাবেচার অন্যতম সমস্যা। এর ফলে বিদেশে যাওয়ার আগেই কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া সম্ভব হয়।

অনেক পরিবার বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাতে ভিটামাটি বা গয়না বিক্রি করে। কেউ কেউ চড়া সুদে ঋণও নেন। কিন্তু বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া বা প্রত্যাশিত বেতন না পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে সেই ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তৈয়ব আলীর ঘটনাতেও দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়ার জন্য বড় অঙ্কের ঋণ ও সম্পদ বিক্রির অর্থ ব্যবহার করেও তিনি প্রত্যাশিত কাজ পাননি। শেষ পর্যন্ত ছয় মাসের মধ্যেই তাঁকে দেশে ফিরতে হয়েছে।

অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কী প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিএমইটির অধীনে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাব্যাংক তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তাঁর মতে, সব ধরনের অর্থ লেনদেন নির্ধারিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে অর্থের প্রবাহ নথিভুক্ত করা এবং অননুমোদিত লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দক্ষতা ও ভাষাগত যোগ্যতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের দর-কষাকষির সক্ষমতা কম থাকে। এর ফলে বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগী ও সাপ্লাই কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে।

এখানে দক্ষতা উন্নয়ন ও ভাষাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়োগের আগে কাজ, বেতন এবং নিয়োগকর্তার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সরকারের উদ্যোগ ও সামনে চ্যালেঞ্জ

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানিয়েছেন, সরকার দেশভিত্তিক অভিবাসন ব্যয় হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ভিসা, নিয়োগ, রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্ট এবং অর্থ লেনদেনের বিভিন্ন ধাপকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সরকারি নির্ধারিত ব্যয় এবং বাস্তবে কর্মীদের দেওয়া অর্থের পার্থক্য কমানো না গেলে বিদেশে কর্মসংস্থানের খরচের চাপ থেকেই যাবে।

বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের বহু পরিবারের জন্য আয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। কিন্তু ভিসা বাণিজ্যে অঘোষিত লেনদেন এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় সেই সুযোগকে অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত করতে পারে।

তাই নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্রে শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা নয়, কর্মীরা কত খরচে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রকৃত চাকরি ও বেতন কতটা নিশ্চিত, এবং অর্থের লেনদেন কতটা স্বচ্ছ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত