ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে নগদ সহায়তা সমন্বয় ও ভর্তুকি একীভূত করলে ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব বলে বাংলাদেশে বিশ্লেষণে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, খাদ্যভিত্তিক একাধিক ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা সবচেয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি। এ জন্য সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আরও নির্ভুলতা আনার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
ফ্যামিলি কার্ড সমন্বয়ে ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষের সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাংকের মূল পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমানে বিভিন্ন খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি এবং নগদ সহায়তা কর্মসূচি আলাদাভাবে পরিচালিত হওয়ায় সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। এসব কর্মসূচির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় করা গেলে একই সম্পদ দিয়ে বেশি মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে বিদ্যমান নগদ সহায়তার সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এ ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
এখানে লক্ষ্য শুধু সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই মূল বিষয়। ফলে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয় সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে উঠে এসেছে।
দেশের অর্থনীতিতে একাধিক চাপ
সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে এই সুপারিশ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম রাজস্ব আহরণ এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বড় ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ব্যাংকিং খাতে দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
রাজস্ব আহরণেও বড় দুর্বলতা
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাকে দেখছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন হার। এর ফলে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
একই সময়ে বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাজেট ঘাটতি ছিল। ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা, ভর্তুকি ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার সুপারিশকে এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই দেখতে হবে।
প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে থাকার পূর্বাভাস
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে।
তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে গতি এলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এই মন্থরতার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব
অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব সরাসরি পড়েছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের ওপরও।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থেমে গেছে এবং বিশেষ করে নারীরা চাকরি হারিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। সেক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড এবং অন্যান্য সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক সহায়তার বাইরে
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
অর্থাৎ সরকারি সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রয়েছে এমন একটি বড় অংশের পরিবার তা থেকে বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ কারণে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করছে। তবে এসব সহায়তার কার্যকারিতা বাড়াতে উপযুক্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা এবং একই পরিবারের জন্য একাধিক কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার সম্ভাব্য ভূমিকা সামনে আসছে।
ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে গুরুত্ব
বিশ্বব্যাংক সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।
এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
এর ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সহায়তা ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড ও বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় এবং ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির সম্প্রসারণ একসঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার লক্ষ্যভিত্তিকতা বাড়াতে পারে।
সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি কঠিন
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা।
বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে। তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বয়কে কেবল কল্যাণমূলক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং সীমিত সরকারি সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের অংশ হিসেবেও দেখছে বিশ্বব্যাংক।
ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার সঙ্গে অন্যান্য নগদ সহায়তা ও খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকির সমন্বয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সম্ভাবনার বিষয়টি এই নীতিগত আলোচনাকেই সামনে এনেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দক্ষতা, অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই একদিকে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার এবং অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা—দুই দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার সমন্বয় সেই সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে উঠে এসেছে।





