যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার ফি নিয়ে নতুন ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প, নতুন ও পুরোনো আবেদনকারীদের জন্য নিয়মের পার্থক্য ও আইনি লড়াই জানুন।
যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসার আবেদনে ১ লাখ ডলার ফি আরোপের নীতি আরও এক বছর বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, হোয়াইট হাউস এ তথ্য জানায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া এই নীতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নতুন ঘোষণার মাধ্যমে তা আরও ১২ মাস বাড়ানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এইচ-১বি আবেদনকারী বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি আর্থিক চাপ থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, যারা পরবর্তী সময়ে এইচ-১বি মর্যাদায় যাচ্ছেন, এবং বিদ্যমান এইচ-১বি ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রে এই নতুন ফি প্রযোজ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচ-১বি ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগদাতাদের নির্দিষ্ট ফি দিয়ে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের কয়েক বছরের জন্য কাজের সুযোগ দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে এই ভিসার ব্যবহার রয়েছে।
এইচ-১বি ভিসার ফি কেন এত আলোচনায়

এইচ-১বি ভিসার সাধারণ ফি সাধারণত ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারের মধ্যে। এর বিপরীতে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত একটি বড় পরিবর্তন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির সমালোচনা করে আসছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, এই কর্মসূচির কিছু অংশ এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠান মার্কিন নাগরিকদের পরিবর্তে তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে মার্কিন শ্রমবাজারে প্রভাব পড়ছে এবং দক্ষ মার্কিন কর্মীদের জন্য চাকরির সুযোগ ও মজুরির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এই কর্মসূচির আরেকটি দিকও রয়েছে। এইচ-১বি ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চ দক্ষতার পেশাজীবীদের নিয়োগ দেওয়া যায় এবং কিছু খাতে যোগ্য মার্কিন কর্মীর ঘাটতিও পূরণ করা সম্ভব হয়। ফলে ভিসা কর্মসূচিটির প্রয়োজনীয়তা ও এর ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
২০২৫ সালে শুরু হয়েছিল ১ লাখ ডলারের নীতি
এইচ-১বি ভিসার ফি বাড়ানোর প্রথম নির্বাহী আদেশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করে ট্রাম্প প্রশাসন। ওই আদেশের মেয়াদ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
নতুন ঘোষণার মাধ্যমে সেই সময়সীমা আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ১৮ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় ২০২৫ সালের নীতিকে আরও ১২ মাস বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ফলে নতুন এইচ-১বি আবেদনকে কেন্দ্র করে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত আরও এক বছর কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নীতিটি সব ধরনের এইচ-১বি পরিস্থিতির ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা পরে এইচ-১বি মর্যাদায় গেলে এবং বিদ্যমান এইচ-১বি ভিসা নবায়ন করলে এই ফি প্রযোজ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি লড়াইয়ে আটকে আছে নীতির ভবিষ্যৎ
ট্রাম্প প্রশাসনের এইচ-১বি ভিসার ফি বাড়ানোর উদ্যোগ এরই মধ্যে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত জুনে বোস্টনের একটি আপিল আদালত একটি ফেডারেল বিচারকের দেওয়া রায় পর্যালোচনা করছে।
ওই ফেডারেল বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা অতিরিক্ত ফিকে বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে সরকারকে ওই বাড়তি ফি আদায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এর ফলে ১ লাখ ডলারের ফি নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আদালতের প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপিল আদালতের পর্যালোচনার ফল নীতিটির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী সংগঠন ইউএস চেম্বার অব কমার্সও এই ফি নিয়ে আলাদা মামলা করেছে। সেই মামলাটিও আপিল আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রশাসন নীতিটি আরও এক বছর বাড়ালেও এর আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
কারা এই ফি থেকে বাইরে থাকছেন
নতুন ঘোষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব এইচ-১বি আবেদনকারীকে একইভাবে ১ লাখ ডলারের ফি দিতে হবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা পরে এইচ-১বি মর্যাদায় গেলে এই নতুন ফি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একইভাবে বিদ্যমান এইচ-১বি ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য নয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা নতুন এইচ-১বি কর্মীদের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্তটি প্রযোজ্য হতে পারে। হোয়াইট হাউসের ১৮ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায়ও নতুন বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা সংশ্লিষ্ট এইচ-১বি কর্মীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে নতুন আবেদন, ভিসা নবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের এইচ-১বি মর্যাদায় যাওয়ার বিষয়গুলো আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন পেশায় প্রভাবের প্রশ্ন
এইচ-১বি ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বিশেষভাবে পরিচিত হলেও এর ব্যবহার শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন পেশায় দক্ষ বিদেশি কর্মীরা এই ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেন।
ফি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারের প্রচলিত মাত্রা থেকে ১ লাখ ডলারে উন্নীত হওয়ায় নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের ব্যয়ের হিসাব বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য নতুন আবেদন করার সিদ্ধান্তে এই অতিরিক্ত অর্থের বিষয়টি বিবেচ্য হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইচ-১বি কর্মসূচি একদিকে উচ্চ দক্ষতার পেশাজীবী নিয়োগে সহায়তা করে, অন্যদিকে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন যে কিছু প্রতিষ্ঠান কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য এটি ব্যবহার করে।
প্রশাসনের যুক্তি বনাম ব্যবসায়িক প্রয়োজন
এই নীতি নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাগুলোর একটি হলো মার্কিন কর্মীদের সুরক্ষা এবং দক্ষ বিদেশি কর্মীর প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য।
ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের নতুন ঘোষণাতেও বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে মার্কিন কর্মীদের প্রতিস্থাপন এবং তুলনামূলক কম মজুরির শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ তুলে নীতিটি বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এইচ-১বি কর্মসূচির সমর্থকদের দৃষ্টিতে দক্ষ বিদেশি কর্মীরা এমন কিছু খাতের কর্মী ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখেন, যেখানে প্রয়োজনীয় যোগ্য মার্কিন কর্মী পর্যাপ্ত নয়। সোর্স প্রতিবেদনে এই দুই ধরনের অবস্থানের কথাই উঠে এসেছে।
ফলে ১ লাখ ডলারের ফি শুধু অভিবাসন নীতির বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার ও বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ট্রাম্প প্রশাসন ১ লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসার ফি আরও এক বছরের জন্য বাড়িয়েছে। তবে নীতিটির বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। বোস্টনের আপিল আদালতে ফেডারেল বিচারকের রায় পর্যালোচনা এবং ইউএস চেম্বার অব কমার্সের মামলাসহ আইনি বিষয়গুলো পরবর্তী পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
এর পাশাপাশি নতুন এইচ-১বি আবেদনকারী, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শিক্ষার্থী এবং বিদ্যমান ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে নিয়মের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ১ লাখ ডলারের ফি নিয়ে আলোচনায় শুধু ঘোষিত অঙ্ক নয়, কোন পরিস্থিতিতে এটি প্রযোজ্য এবং কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়—সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অন্তত আরও এক বছরের জন্য নতুন এইচ-১বি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থপ্রদানের শর্ত বহাল থাকছে। একই সময়ে আদালতের সিদ্ধান্ত নীতিটির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও নজরে থাকবে।





