আরও খবর

Shikor Web Image - 2026-03-01T134956.771
কেন ইরানের পক্ষে ‘গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান’ নিয়েছে চীন?
Shikor Web Image (98)
ইরানে মার্কিন হামলা: আগেই সমর্থন দিয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ
Shikor Web Image (97)
খামেনির উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, কাদের নাম শোনা যাচ্ছে
Shikor Web Image (92)
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা শুরুর ঘোষণা ইরানের
Shikor Web Image (89)
হামলার সময় কী করছিলেন খামেনি, জানাল ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি

মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল: তীব্র ক্ষোভ ঝাড়ল ইসরায়েল

মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল করায় নিউইয়র্কে রাজনৈতিক উত্তাপ। ইসরায়েলের তীব্র নিন্দা, মানবাধিকারকর্মীদের প্রশংসা—জানুন বিস্তারিত।

নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল করার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ফিলিস্তিনি অধিকার সমর্থক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েল সরকার একে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘উসকানিমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং নিউইয়র্ক সিটির নীতিগত অবস্থানেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। মামদানির প্রথম দিনের পদক্ষেপ ঘিরে তাই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

পটভূমি: কোন নির্বাহী আদেশগুলো বাতিল হলো

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই জোহরান মামদানি তার পূর্বসূরি এরিক অ্যাডামসের স্বাক্ষরিত সব নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন, যেগুলো ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের পর কার্যকর হয়েছিল। ওই সময়ে অ্যাডামসের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়, যা তার প্রশাসনের শেষ ভাগকে বিতর্কিত করে তোলে।

বাতিল হওয়া আদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল এমন একটি নির্দেশনা, যেখানে নিউইয়র্ক সিটির কোনো দপ্তর বা কর্মকর্তা এমন চুক্তিতে যুক্ত হতে পারতেন না, যা ইসরায়েল রাষ্ট্র, ইসরায়েলের নাগরিক বা মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘বৈষম্যমূলক’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সমালোচকদের মতে, এই আদেশের মাধ্যমে কার্যত ইসরায়েল বয়কটের যেকোনো উদ্যোগকে প্রশাসনিকভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছিল।

মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল কেন গুরুত্বপূর্ণ

মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে।

প্রথমত, এটি নিউইয়র্ক সিটির প্রশাসনিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, পূর্বের আদেশগুলো বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত করেছিল।

দ্বিতীয়ত, এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিন প্রশ্নে নিউইয়র্ক সিটির অবস্থানকে আরও মানবাধিকারকেন্দ্রিক করার ইঙ্গিত দেয়। মামদানি প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নীতি সমালোচনা করা মানেই তা বিদ্বেষমূলক নয়।

তৃতীয়ত, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন বিতর্কে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা উসকে দিয়েছে।

আইএইচআরএ সংজ্ঞা বাতিল ও বিতর্ক

বাতিল হওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশ ছিল ইন্টারন্যাশনাল হলোকাস্ট রিমেমব্রেন্স অ্যালায়েন্স (IHRA) প্রস্তাবিত ইহুদি-বিদ্বেষের সংজ্ঞা গ্রহণ।

ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই সংজ্ঞার সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, সংজ্ঞাটিতে থাকা ১১টি উদাহরণের মধ্যে ছয়টি সরাসরি ইসরায়েলের সমালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ইসরায়েলি নীতি বা সামরিক কর্মকাণ্ডের যৌক্তিক সমালোচনাও ‘ইহুদি-বিদ্বেষ’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্যালেস্টাইন ইয়ুথ মুভমেন্ট–এনওয়াইসি’র সদস্য নাসরিন ইসা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও তার সমর্থকরা মতবিরোধকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, মামদানির এই সিদ্ধান্ত নিউইয়র্কবাসীর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া

কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)–এর নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের প্রধান আফাফ নাশের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ইসরায়েলি সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা বা বয়কটের অধিকার সীমিত করা অসাংবিধানিক।

তার মতে, এসব আদেশ আদৌ জারি করা উচিত ছিল না। বরং সেগুলো প্রত্যাহার করাই ছিল যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ।

এই প্রতিক্রিয়াগুলো স্পষ্ট করে যে মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল সিদ্ধান্তটি শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং নাগরিক অধিকার ও সংবিধানিক প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

ইসরায়েলের তীব্র প্রতিক্রিয়া

তবে এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে ইসরায়েল থেকে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানায়, মামদানি তার “আসল চেহারা” প্রকাশ করেছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, এই পদক্ষেপ নেতৃত্বের পরিচয় নয়; বরং এটি ইহুদি-বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার মতো বিপজ্জনক।

এছাড়া ইসরায়েলের প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি মামদানির সমালোচনা করতে গিয়ে ইসলামোফোবিক ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি মামদানিকে ‘হামাসের প্রতি সহানুভূতিশীল’ আখ্যা দিয়ে লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের সঙ্গে তুলনা টানেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই এবং এগুলো রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।

যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অবস্থান

ইসরায়েল একা নয়; যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও বিষয়টি নজরে রেখেছে। বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকার বিভাগের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হারমিত ধিলন সতর্ক করে বলেন, নিউইয়র্কে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হলে ফেডারেল সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে।

তার ভাষায়, প্রয়োজনে তদন্ত, মামলা এমনকি অভিযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্তে ফেডারেল সরকারের সীমা কোথায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: সিদ্ধান্তের অন্তর্নিহিত বার্তা

বিশ্লেষক নাসরিন ইসার মতে, ইসরায়েলের তীব্র প্রতিক্রিয়া মামদানির নীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং জনমত নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল। তিনি বলেন, নিউইয়র্কের মতো বৈচিত্র্যময় শহরে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে এই সিদ্ধান্ত প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মামদানির ইসরায়েলপন্থী নির্বাহী আদেশ বাতিল ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও নীতিগত বিতর্কের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব

এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শহরগুলোতে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন ইস্যুতে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

অনেক মানবাধিকার সংগঠন মনে করছে, নিউইয়র্কের এই পদক্ষেপ অন্য শহরগুলোকেও সাহস জোগাবে।

সর্বাধিক পঠিত