টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হারার পর আবার আলোচনায় দক্ষিণ আফ্রিকার ‘চোকার্স’ তকমা। কোচ শুকরি কনরাডের প্রতিক্রিয়াও এসেছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হারার পর আবারও আলোচনায় এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘চোকার্স’ তকমা। অপরাজিত দল হিসেবে টুর্নামেন্টের শেষ চারে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ পর্যন্ত একপেশে ম্যাচে হেরে বিদায় নেয়। ম্যাচ শেষে দলের প্রধান কোচ শুকরি কনরাড বিষয়টি নিয়ে রসিকতার সুরে প্রতিক্রিয়া দিলেও, ইতিহাস বলছে—আইসিসি টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যর্থতা নতুন নয়।
এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে চলে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘদিনের সেই পরিচিত তকমা—‘চোকার্স’।
সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে একপেশে হার

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এবারের আসরে দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপ ও সুপার পর্বে দারুণ ধারাবাহিকতা দেখায়। পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত দল হিসেবেই তারা সেমিফাইনালে ওঠে। ফলে শিরোপা জয়ের আশা ও আত্মবিশ্বাস ছিল অনেক বেশি।
কিন্তু সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ছন্দ একেবারেই ধরে রাখতে পারেনি প্রোটিয়ারা।
নিউজিল্যান্ড ম্যাচটি জিতে নেয় ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে, যা সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য ছিল হতাশাজনক ফল। এই জয়ের মাধ্যমে কিউইরা নিশ্চিত করে ফাইনালের টিকিট।
কোচ শুকরি কনরাডের প্রতিক্রিয়া
ম্যাচ শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান কোচ শুকরি কনরাড ‘চোকার্স’ তকমা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কিছুটা রসিকতার ভঙ্গিতে মন্তব্য করেন।
তার ভাষায়,
“আমি নিশ্চিত নই এটাকে ‘চোক’ বলা যায় কি না। আমার কাছে তো মনে হয়েছে এটি একেবারেই বড় ধরনের মার।”
তবে একই সঙ্গে নিজের দলের খেলোয়াড়দের প্রশংসাও করেন তিনি।
তিনি বলেন,
“আমি এই ছেলেদের নিয়ে গর্বিত। আমরা যখন দেশ ছেড়েছিলাম, তখন খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিল আমরা সেমিফাইনালে উঠতে পারব। যদিও এটা কোনো সান্ত্বনা নয়।”
কোচের এই বক্তব্যে হতাশা ও বাস্তবতার প্রতিফলনই ফুটে উঠেছে।
আফ্রিকার ‘চোকার্স’ তকমা – দীর্ঘ ইতিহাস
ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘চোকার্স’ তকমা বহুদিনের আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে আইসিসি টুর্নামেন্টের নকআউট ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই এই তকমাটি তাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
১৯৯১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসার পর দক্ষিণ আফ্রিকা প্রায় সব বড় আইসিসি টুর্নামেন্টেই নিয়মিত অংশ নিয়েছে। কিন্তু সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বড় শিরোপা তাদের নাগালের বাইরে থেকেই গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
-
১৯৯২ সালের পর থেকে আইসিসি টুর্নামেন্টে
-
মোট ২১টি নকআউট ম্যাচ খেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা
-
এর মধ্যে ১৫টিতেই হার দেখেছে দলটি
এই পরিসংখ্যানই অনেকের কাছে ‘চোকার্স’ তকমাকে আরও জোরালো করেছে।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ: সবচেয়ে নাটকীয় স্মৃতি
দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ও বেদনাদায়ক ম্যাচগুলোর একটি ছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শেষ ওভারে জয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার দরকার ছিল মাত্র এক রান।
তখন ক্রিজে ছিলেন ল্যান্স ক্লুজনার ও অ্যালান ডোনাল্ড। কিন্তু দুজনের ভুল বোঝাবুঝির কারণে রান নেওয়ার সময় ডোনাল্ড রান আউট হয়ে যান।
ফলাফল:
-
ম্যাচটি টাই হয়
-
সুপার সিক্সে ভালো রেকর্ড থাকার কারণে
-
অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে উঠে যায়
এই ঘটনাটি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত হিসেবে এখনো আলোচিত।
একের পর এক নকআউট ব্যর্থতা
১৯৯৯ সালের সেই হতাশার পরও দক্ষিণ আফ্রিকার ভাগ্য খুব একটা বদলায়নি।
আইসিসি টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে বারবার ব্যর্থতা এসেছে।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা:
-
১৯৯২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল – ইংল্যান্ডের কাছে হার
-
১৯৯৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল – ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পরাজয়
-
২০১৫ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল – নিউজিল্যান্ডের কাছে হার
-
২০২৩ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল – অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজয়
প্রতিটি ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকা ভালো অবস্থানে থেকেও শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করতে পারেনি।
২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থতা
দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক হতাশাগুলোর মধ্যে অন্যতম ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের শেষদিকে জয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়োজন ছিল মাত্র:
-
২৬ রান
-
হাতে ছিল ২৪ বল
হেনরিখ ক্লাসেনের ঝড়ো ইনিংসে দলটি জয়ের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৭ রানে হেরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
এই হার আবারও ‘চোকার্স’ তকমা নিয়ে আলোচনা উসকে দেয়।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে সাফল্য
তবে সব গল্পই হতাশার নয়।
২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দীর্ঘদিনের আইসিসি ট্রফি খরা কাটিয়েছে।
এই সাফল্য দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এখনও বড় শিরোপা তাদের অধরাই রয়ে গেছে।




