হিজবুল্লাহর ১৫০ রকেট, ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল; ভয়ংকর রাত দেখল ইসরায়েল উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ভয় সৃষ্টি করেছে। বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বুধবার রাত ইসরায়েলের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহ ও ইরানের রকেট হামলা চালানো হয়েছে। লেবাননের সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহ অন্তত ১৫০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে। একই সময়ে ইরান থেকে ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এই হামলাকে সমন্বিত ও তীব্র আক্রমণে পরিণত করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, এই জোরালো হামলার কারণে দেশব্যাপী সাইরেন বেজে উঠেছে এবং লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বিমান বাহিনীর মধ্যে চলমান লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহ এই পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে, তারা হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যেই এই অভিযান পরিচালনা করেছে।
হামলার তীব্রতা ও বিস্তৃতি
হামলা এতটাই তীব্র ছিল যে গ্যালিলি থেকে হাইফা এবং সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের জনপদগুলোতেও সতর্কতা সংকেত বাজানো হয়। আইডিএফ বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও কিছু স্থানে আঘাতের খবর এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর ইসরায়েলের বি’ইনা শহরে রকেট আঘাতে একটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত দুজন সামান্য আহত হয়েছেন। মাগেন ডেভিড আদম অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে একজন ৩৫ বছর বয়সী নারী এবং একজন ৫০ বছর বয়সী পুরুষ রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় কিছু বাসিন্দাকে আতঙ্কজনিত কারণে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।
বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত হামলা অব্যাহত থাকে। উত্তরাঞ্চলের নাহারিয়া, একর ও হাইফার উপকণ্ঠে ড্রোন অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বারবার সাইরেন বাজানো হয়। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা তেল আবিবের কাছে অবস্থিত ইসরায়েলি গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০-এর সদর দপ্তর বা ‘গ্লিলট বেস’ লক্ষ্য করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
হিজবুল্লাহ ও ইরানের রকেট হামলা: ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি বিমান বাহিনী জবাবে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়েহে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, এই অভিযান মূলত হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার ও অস্ত্র গুদাম ধ্বংস করতে পরিচালিত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, বৈরুত এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় আঘাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
একজন উচ্চ পর্যায়ের ইসরায়েলি সরকারি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইসরায়েল দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে। BBC রিপোর্ট অনুসারে, ইরান ও হিজবুল্লাহর বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা আগেই তেল আবিবে ছিল।
হিজবুল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
হিজবুল্লাহ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, লেবাননের বিভিন্ন শহর এবং বৈরুতের শহরতলিতে ইসরায়েলি হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে তারা এই রকেট হামলা চালিয়েছে। তারা এটিকে একটি নতুন পর্যায়ের শুরু হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট কমান্ড উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয় বা বোম্ব শেল্টারেই থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অনেক স্থানে রকেট আঘাতে খোলা জায়গায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, যা রাতভর ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
এই হামলা ইরান ও হিজবুল্লাহর সমন্বিত পরিকল্পনার প্রমাণ দেয়। এটি শুধুমাত্র ইসরায়েলের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলকে লক্ষ্য করল না, বরং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা করল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলো এখন উত্তেজনার এই নতুন ধাপকে কড়া নজরে রাখছে।




