ফের বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এবং কূটনৈতিক আলোচনা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় এক শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ার কারণেই এই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগে মাত্র এক কার্যদিবসেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে কয়েক সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের এই ওঠানামা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই তেলের দাম বেড়েছে

আন্তর্জাতিক তেল বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মঙ্গলবার ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ১২ ডলার বেড়ে ৮৪ দশমিক ৮৯ ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের কার্যদিবসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় সাত শতাংশ কমে গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে। এদিন ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৭৭ সেন্ট বা প্রায় এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮১ দশমিক ১১ ডলারে দাঁড়ায়।
এর আগের দিন ডব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে এক সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি বিবেচনায় নেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যায়।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাব
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা।
দুই দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা কমাতে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালাবে না।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে যায়। কারণ, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে এবং তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি থাকবে না।
তবে পরবর্তীতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি জানান, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো আলোচনা চলছে না এবং ভবিষ্যতে কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরিকল্পনাও নেই।
ইরানের অবস্থানে বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা
ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশঙ্কা দেখা দেয়।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী অঞ্চল। ফলে এই অঞ্চলের সামরিক বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, পরিবহন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ের জ্বালানি ব্যয়ের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
তেলের বাজারে ওঠানামার পেছনে মূল কারণ
আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে রয়েছে:
- মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি
- তেল সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা
- বড় দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্ক
- বিনিয়োগকারীদের বাজার প্রত্যাশা
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে আবারও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। তবে উত্তেজনা বাড়লে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু তেল বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়েও পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তন তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে দাম কমলেও ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগামী দিনে কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।





