মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত রাহুল–প্রিয়াঙ্কা, রাহুল গান্ধী আটক হওয়ার পর দিল্লিতে তীব্র উত্তেজনা। মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ও দুই ঘণ্টা পর মুক্তি।
নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ থেকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের আটক করে পুলিশ। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার বিকেলে এই অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পুলিশ জোর করে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়। রাহুল গান্ধীকে আটকের প্রায় দুই ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে রাত ৯টার দিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুক্তি পান।
রাহুল গান্ধী আটক হওয়ার আগে কী ঘটেছিল

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন। গত সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে দিল্লি পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন।
এরপর মঙ্গলবার রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা সংসদের স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা নিয়ে আলোচনা এবং বিষয়টি সংসদে তোলার দাবি জানান। তবে কোনো আশ্বাস না পাওয়ার পর তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেন।
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা প্রথমে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে গিয়ে পুলিশি অভিযানে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে যান। পরে তাঁরা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাড়িতে যান। সেখান থেকেই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা ৭ লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মোদির বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের অবস্থান
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কংগ্রেসের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনায় বসেন। এই কর্মসূচি পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদেরও আকস্মিকভাবে চমকে দেয়।
কিছু সময় পর কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে যান প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন। রাহুল গান্ধীর সঙ্গে জিতেন্দ্র সিংকে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়।
এরই মধ্যে বিক্ষোভস্থলে নেতাকর্মীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কেরল ও কর্ণাটকের দুই কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন ও ডি কে শিবকুমার, কে সি বেনুগোপাল, এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ অনেকে সেখানে যোগ দেন।
কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভের মূল দাবির মধ্যে ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার জবাবদিহি এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
রাহুল গান্ধী আটক: আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে সরকারের বক্তব্য
সন্ধ্যা ৬টার দিকে জিতেন্দ্র সিং গণমাধ্যমকে বলেন, রাহুল গান্ধীর মূল দাবি ছিল সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সরকার বুধবারই এ বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত ছিল।
তবে সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরে রাহুল গান্ধী শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও সামনে আনেন। সরকার সেই দাবি মেনে নিতে রাজি হয়নি।
এরপরই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ নেতাদের জোর করে বাসে তুলে নেওয়া শুরু হয়।
রাহুল গান্ধীকে মাটিতে শুয়ে পড়তে দেখা যায়। ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্য তাঁকে জোর করে তুলে বাসে নিয়ে যান। ধস্তাধস্তির সময় তাঁর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়।
পরে রাহুল গান্ধীসহ আটক নেতাদের একটি দলকে দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে রাহুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে নেওয়া হয় দিল্লির মন্দির মার্গ থানায়। ঘটনার পর কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ওই থানায় যান।
রাত ৯টার দিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুক্তি পান।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য
বিক্ষোভ চলাকালে রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ একাধিক বার্তা দেন। তিনি বলেন, পুলিশি হামলার জবাবদিহি চাইতেই তাঁরা সেখানে গেছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার কোনো দায় নিতে এবং সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাইছে না।
রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করার দায়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।
অন্য এক বার্তায় তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর হামলার সমান। তাঁর দাবি, কোনো জবাবদিহি ছাড়া বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ এবার দেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের আওয়াজ ব্যর্থ হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ
ভারতে মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তির পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি-কাম-এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি প্রায় দুই মাস ধরে আন্দোলন করছে।
প্রথমে দিল্লিতে এবং পরে দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। প্রায় এক মাস আগে দিল্লিতে নতুন করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে সংগঠনটি।
২৪ দিন আগে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হলে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী এবং ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।
২০ জুলাই ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হয়। এর দুই দিন আগে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থানমঞ্চ থেকে সোনম ওয়াংচুককে সরিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।
সংসদ অভিমুখে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে সংঘর্ষ
সোমবার হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সংসদ ভবন অভিমুখে কর্মসূচিতে অংশ নেন। পুলিশের অনুমান অনুযায়ী, এই সংখ্যাটি প্রায় ৫০ হাজার হতে পারে।
আন্দোলনকারীদের আটকাতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। শতাধিক পুলিশ ও শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে দেখতে যান। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডাও আহতদের সঙ্গে দেখা করেন।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন অব্যাহত
সোমবার দুই ছাত্রনেতার সঙ্গে দেখা করেন জেপি নাড্ডা। সিজেপি নেতারা তাঁকে তিনটি দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি দেন।
দাবিগুলোর মধ্যে ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়া এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা ২০ শিক্ষার্থীর পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে দেওয়া।
সিজেপি নেতাদের দাবি, সরকার তাঁদের কোনো দাবিই মেনে নেয়নি।
তবে দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, সোনম ওয়াংচুকের পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এরপর মঙ্গলবার বিকেলে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জানিয়েছেন, সোনম ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করছেন না।
আন্দোলনের অবস্থান বদলালেও প্রতিবাদ অব্যাহত
সোমবারের ঘটনার পর দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের অবস্থানমঞ্চ ভেঙে দেয়। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে ছাত্রনেতারা সেখানে আবার অবস্থান শুরু করেন।
সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে জানান, তাঁরা আপাতত সংসদ ভবন অভিমুখে নতুন করে যাত্রার ডাক দেবেন না। তবে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
গত কয়েক দিনে প্রায় সব বিরোধী দল এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। শুরুতে কংগ্রেস আন্দোলনটিকে সমর্থন না করলেও পরে কংগ্রেস নেতারা সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন। রাহুল গান্ধীও আন্দোলনের পক্ষে বক্তব্য দেন।
মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এই কর্মসূচি ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে নজর কেড়েছে, কারণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এর আগে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এভাবে ধরনায় বসেননি।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অভিযানের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতে বিরোধী দল ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধী আটক হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। সরকার সংসদে আলোচনার প্রস্তুতির কথা বললেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নিয়ে এখনো সমঝোতা হয়নি। ফলে শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন পরবর্তী সময়ে কোন দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





