আরও খবর

Shikor Web Image (52)
শিবিরকে প্রতিটি ক্যাম্পাসে হাজার বার ‘গুপ্ত’ বলার ঘোষণা: ছাত্রদল সম্পাদকের
Shikor Web Image (49)
সৌদি পৌঁছেছেন ২০৫৫৩ হজযাত্রী: একজনের মৃত্যু
Shikor Web Image (47)
বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের আশ্বাস দিল ইরান
Shikor Web Image (43)
শেরপুরে পাচারের সময় ৮০০ লিটার ডিজেল জব্দ: আটক ২
Shikor Web Image (28)
মবের শহরে পরিণত হয়েছে দেশ: সংসদে রুমিন ফারহানা

উন্নয়ন বাজেটে বেজায় ফাঁক

উন্নয়ন বাজেটে বেজায় ফাঁক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ। বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেট বা এডিপিতে (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার এই উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কাঠামো ভবিষ্যতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বাড়াতে পারে।

থোক বরাদ্দে বিশাল অংশ, প্রকল্পে কম বরাদ্দ

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে এক লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিশেষ উন্নয়ন সহায়তায় থোক বরাদ্দ হিসেবে। অন্যদিকে সরাসরি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন বাজেট থোক বরাদ্দ যদি সুনির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক না হয়, তবে তা প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এই অর্থ বছরের শেষ পর্যন্ত ব্যবহারই করা যায় না।

বাস্তবায়নে বড় ঘাটতির নজির

চলতি অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এডিপির মোট বরাদ্দের মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। গত অর্থবছরে মোট ব্যয় হয়েছিল এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা ঘোষিত বাজেটের তুলনায় কম।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগের আওয়ামী লীগ সরকার সর্বোচ্চ দুই লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করেছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তা কমিয়ে প্রথমে দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি এবং পরে সংশোধিত বাজেটে দুই লাখ কোটিতে নামিয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

খাতভিত্তিক বরাদ্দ: কোথায় কত টাকা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের চিত্র নিম্নরূপ—

স্বাস্থ্য খাত

  • চলমান প্রকল্পে: ৬,০০৮ কোটি টাকা
  • থোক বরাদ্দ: ২০,৮০০ কোটি টাকা

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা

  • প্রকল্পে: ৫,০৪৮ কোটি টাকা
  • থোক বরাদ্দ: ১৬,২৯৯ কোটি টাকা

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ

  • প্রকল্পে: ৩০,১৬৪ কোটি টাকা
  • থোক বরাদ্দ: ১৩,৯০২ কোটি টাকা

অন্যান্য খাত

  • মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা: ১১,৫০০ কোটি টাকা
  • স্থানীয় সরকার বিভাগ: ৭,৫৬২ কোটি টাকা
  • স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ: ৬,৮০০ কোটি টাকা
  • কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা: ৩,০৭৯ কোটি টাকা

এ ছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন খাতে ৩৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অতীতের তুলনায় ব্যতিক্রমী প্রবণতা

আগের অর্থবছরগুলোতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এত বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দের প্রচলন ছিল না। সাধারণত বিশেষ প্রয়োজনে ৫ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থোক বরাদ্দ রাখা হতো।

তুলনামূলকভাবে দেখা যায়—

  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৪,৬৯৬ কোটি টাকা
  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ৬,৩২৮ কোটি টাকা
  • চলতি অর্থবছর: ১০,৭৭১ কোটি টাকা

অর্থাৎ, এবার থোক বরাদ্দের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে, যা বাজেট কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

উন্নয়ন বাজেট থোক বরাদ্দ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ এই বাজেট কাঠামোকে স্ববিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে বাজেট কমিয়ে আনার পর আবার হঠাৎ করে এত বড় বাজেট প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার ভাষায়, অতীতে দেখা গেছে বড় বাজেটের একটি বড় অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। একই জনবল ও সক্ষমতা দিয়ে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁট করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, থোক বরাদ্দ কোনো ভালো প্রক্রিয়া নয়। কারণ এটি নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক নয়, ফলে পরবর্তীতে অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা তৈরি হয়।

অনুমোদনহীন প্রকল্পে বরাদ্দ: নতুন ঝুঁকি

এডিপিতে এমন কিছু প্রকল্পের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেগুলো এখনো অনুমোদন পায়নি। উদাহরণ হিসেবে, সেতু বিভাগ সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য ২,৫৩৯ কোটি টাকা চাইলেও তাদের দেওয়া হয়েছে ২,১৬৬ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনুমোদনহীন প্রকল্পে উন্নয়ন বাজেট থোক বরাদ্দ রাখা হলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব বরাদ্দ পরবর্তীতে পুনর্বিন্যাস বা স্থানান্তর করা হয়, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার লক্ষণ।

সেতু বিভাগের ব্যাখ্যা

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানিয়েছেন, তাদের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বর্তমানে পাইপলাইনে রয়েছে। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতিমূলক কাজ—যেমন ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা প্রণয়ন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।

তার মতে, আগামী অর্থবছরেই এসব প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে।

বড় প্রকল্প শেষ, তবুও বাড়ছে বরাদ্দ

পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় মেগাপ্রকল্প শেষ হওয়ার পর সাধারণত ব্যয় কমার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে—অনিশ্চিত প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ছে।

এটি ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উন্নয়ন বাজেট থোক বরাদ্দ: ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন বাজেট থোক বরাদ্দ বাড়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি, অর্থ অপচয় এবং পরিকল্পনার দুর্বলতা আরও প্রকট হতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত