বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ চাপে থাকতে পারে ২০২৭ সাল পর্যন্ত । বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ, দাম বৃদ্ধি ও সংকটের আশঙ্কা আরও তীব্র হচ্ছে
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, এলএনজি সরবরাহ সংকট ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। আঞ্চলিক সংঘাত, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং উৎপাদন হ্রাসের কারণে বৈশ্বিক গ্যাস বাজারে অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইইএ-এর এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইয়েনি সাফাক-এর প্রতিবেদনের বরাতে উঠে এসেছে।
বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে যে সংকট চলছে, তা দ্রুত সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং পরিস্থিতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
হরমুজ প্রণালি ও ভূরাজনৈতিক সংকট
সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে। মার্চ মাস থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি সরবরাহ কার্যত বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি বাজারে।
এই পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম ২০২৩ সালের শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এলএনজি সরবরাহ সংকট ২০২৭: মূল কারণগুলো
আইইএ-এর বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হয়েছে—
✔ উৎপাদন হ্রাস
বৈশ্বিক এলএনজি উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে।
✔ মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি কমে যাওয়া
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি হ্রাস সরবরাহ সংকট আরও বাড়িয়েছে।
✔ অবকাঠামো বিলম্ব
নতুন এলএনজি প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে যেতে পারে।
সরবরাহ ঘাটতির ভয়াবহ পূর্বাভাস
বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ঘনমিটার সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
এটি বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে এবং দাম অস্থিতিশীল রাখবে।
চাহিদা কমলেও সংকট কাটছে না
উচ্চমূল্যের কারণে অনেক দেশ জ্বালানি ব্যবহারে পরিবর্তন আনছে।
ইউরোপে মার্চ মাসে গ্যাসের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কমেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ এতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে আইইএ বলছে, এসব উদ্যোগ কাঠামোগত সংকট মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়।
এশিয়ায় প্রতিযোগিতা ও চাপ বৃদ্ধি
এশিয়ার অর্থনীতিগুলো সীমিত এলএনজি কার্গোর জন্য প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে চাপ আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
তারা বলছেন, সমাধানের জন্য প্রয়োজন—
- সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণ
- আন্তর্জাতিক সমন্বয় বৃদ্ধি
- নতুন জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ
এগুলো না হলে ইউরোপ ও তুরস্কের মতো আমদানি নির্ভর অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক সতর্কতা আরও বাড়ছে
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আইইএ-এর মতে, এই সংকট কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও সরবরাহ বিঘ্ন
ইরান-সম্পর্কিত উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ আরও কমে যাচ্ছে।
কিছু বিশ্লেষণ বলছে, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব শুরু
এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে—
- শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমারে জ্বালানি রেশনিং
- ফিলিপিন্সে চার দিনের কর্মসপ্তাহ
- ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সাশ্রয় উদ্যোগ
নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক
উচ্চমূল্যের কারণে অনেক দেশ আবার কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সৌর শক্তি, বৈদ্যুতিক যান এবং ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগও বাড়ছে।
বিশেষ করে চীনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে।




