এককভাবে লড়বে জামায়াত ও এনসিপি শেষ মুহূর্তে হতে পারে সমঝোতার ইঙ্গিত—ঢাকা দক্ষিণে কে এগিয়ে, জানুন বিস্তারিত।
আসন্ন সিটি নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াত এনসিপি সিটি নির্বাচন প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সংসদে জোটবদ্ধ থাকলেও এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াতে পারে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দুই দলই নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যদিও শেষ মুহূর্তে সমঝোতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না শীর্ষ নেতারা।
নতুন মেরুকরণ: জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মধ্যে আনুষ্ঠানিক জোট গঠিত হয়। সেই সময় থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা যৌথভাবে নিয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করার কারণে এনসিপির বেশ কিছু নেতা দল ছাড়লেও জোট ভাঙেনি। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন ভোট সামনে আসতেই দুই দলের কৌশলে ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় দুই দলই নিজেদের প্রার্থী দাঁড় করাতে চায়, যা জোট রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
প্রার্থী ঘোষণা: ঢাকা দক্ষিণে দ্বিমুখী লড়াই
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াত ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করতে চায়। অন্যদিকে এনসিপি ইতোমধ্যে তাদের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে।
এনসিপি জানিয়েছে, তারা পাঁচটি সিটিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে এবং ডিএসসিসি নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
নির্বাচিত হলে ঢাকার দক্ষিণের বাসিন্দাদের ময়লার বিল দিতে হবে না।
অন্যদিকে সাদিক কায়েম বলেছেন—
তিনি ঢাকার দক্ষিণের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন পাচ্ছেন এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চান।
জামায়াত এনসিপি সিটি নির্বাচন: কৌশলগত অবস্থান
এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত
দুই দলের নেতারা জানিয়েছেন, আপাতত তারা এককভাবে নির্বাচন করার দিকেই এগোচ্ছেন।
এনসিপির দফতর সম্পাদক সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন—
“এই মুহূর্তে জোটগত নির্বাচনের কোনো আলোচনা নেই। আমাদের প্রার্থীরা নিজ নিজভাবে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম। তার মতে—
বর্তমান সিদ্ধান্ত এককভাবে নির্বাচন করা, তবে পরিস্থিতি বদলালে বৃহত্তর স্বার্থে আলোচনা হতে পারে।
সমঝোতার সম্ভাবনা
যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি, দুই দলের শীর্ষ নেতারা শেষ মুহূর্তে সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।
এনসিপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন—
তারা জোটগতভাবে নির্বাচন করতে আগ্রহী, তবে সেক্ষেত্রে জামায়াতকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিটিতে ছাড় দিতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের ক্ষেত্রে কোনো আপসের সুযোগ নেই বলে তারা স্পষ্ট করেছেন।
ছাত্রশিবিরের অবস্থান: নতুন জটিলতা
সাদিক কায়েমকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে তার সংগঠন ছাত্রশিবিরে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদের সই করা এক ঘোষণায় বলা হয়েছে—
দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেউ অন্য দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে বা প্রার্থী হতে পারবেন না।
এই সিদ্ধান্ত সাদিক কায়েমের প্রার্থিতা নিয়ে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
জানা গেছে—
- দুই মাস পর শিবিরের সম্মেলনে দায়িত্ব ছাড়বেন তিনি
- ডাকসুর মেয়াদও সেপ্টেম্বরে শেষ হবে
- এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেবেন
- তখনই তাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে
তরুণ নেতৃত্বে জোর দিচ্ছে জামায়াত
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, দলটি এবার তরুণ ও জনপ্রিয় মুখ সামনে আনতে চায়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বার্তা দিতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
দলের এক নেতা জানান—
সাদিক কায়েমের জনপ্রিয়তা এবং তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের পরিকল্পনা: ১২ সিটিতে প্রার্থী
জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন—
- তারা ১২টি সিটিতেই প্রার্থী দিতে চায়
- জনপ্রিয় ও তরুণ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে
- ঢাকা দক্ষিণে সাদিক কায়েমই সম্ভাব্য প্রার্থী
এছাড়া ছাত্রশিবিরের সাবেক কয়েকজন সভাপতির নামও মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় অবস্থান: দলীয় প্রার্থীই অগ্রাধিকার
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন—
স্থানীয় নির্বাচনগুলো নিজ নিজ দলের ব্যানারে করা হবে এবং কেন্দ্র থেকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হবে।
এতে স্পষ্ট—
জোট থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত এনসিপি সিটি নির্বাচন একটি অনিশ্চিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
দুই দলের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
- উভয় দলই নিজেদের শক্তি যাচাই করতে চায়
- একই সঙ্গে জোট ভাঙার ঝুঁকিও নিতে চায় না
- তাই শেষ মুহূর্তে সমঝোতার দরজা খোলা রাখা হয়েছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
এই নির্বাচন শুধু স্থানীয় সরকার নয়, ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়,
জামায়াত ও এনসিপি এখন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে।
একদিকে জোট বজায় রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে নিজেদের শক্তি প্রমাণের ইচ্ছা।
তাই শেষ পর্যন্ত তারা একসাথে লড়বে নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী হবে—
তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ঠিক আগে।




