আনভীর গ্রেফতার, কালের কণ্ঠ বন্ধ ও ক্ষমা চাওয়া সম্পর্কে যা জানা গেল, কালের কণ্ঠ ভুয়া ফটোকার্ড নিয়ে ছড়ানো ৩টি দাবির সত্যতা যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার। আনভীর গ্রেফতার, ক্ষমা চাওয়া ও পত্রিকা বন্ধের দাবি ভুয়া বলে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি কালের কণ্ঠ ভুয়া ফটোকার্ড ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যমে এনসিপি নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইনে কালের কণ্ঠের ডিজাইন অনুকরণ করে কয়েকটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। এসব ফটোকার্ডে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের গ্রেফতার, কালের কণ্ঠ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো দাবি করা হয়। তবে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে এসব দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
সূত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন গণমাধ্যমে হাসনাত আব্দুল্লাহকে নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর বিপরীতে এনসিপির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর এবং কালের কণ্ঠকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে কালের কণ্ঠের লোগো ও ডিজাইন ব্যবহার করে অন্তত তিনটি ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেগুলোতে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়।
কালের কণ্ঠ ভুয়া ফটোকার্ডে কী কী দাবি করা হয়েছিল?
প্রচারিত ফটোকার্ডগুলোতে মূলত তিন ধরনের দাবি করা হয়।

- হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের কারণে কালের কণ্ঠ বন্ধ হওয়ার পথে এবং সায়েম সোবহান আনভীর গ্রেফতার হয়েছেন।
- মুনিয়া হত্যা মামলায় আনভীর গ্রেফতার হয়েছেন এবং এ বিষয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বক্তব্য দিয়েছেন।
- হাসনাত আব্দুল্লাহকে নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য কালের কণ্ঠ নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে।
এসব দাবিই কালের কণ্ঠের অফিসিয়াল ডিজাইন অনুসরণ করে তৈরি করা ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়ানো হয়।
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে
রিউমর স্ক্যানার জানায়, ভাইরাল হওয়া কালের কণ্ঠ ভুয়া ফটোকার্ড কালের কণ্ঠ প্রকাশ করেনি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কালের কণ্ঠের ডিজাইন নকল করে এসব ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে।
ফটোকার্ডগুলোতে কালের কণ্ঠের লোগো ব্যবহার করা হলেও প্রকাশের তারিখ হিসেবে ২৯ জুন ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল পর্যালোচনা করে ওই তারিখে এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২৯ জুন কালের কণ্ঠে কী প্রকাশিত হয়েছিল?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২৯ জুন কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজে “হাসনাতের দাপটে আক্রান্ত এক দিনমজুর পরিবার” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়েছিল।
রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভাইরাল হওয়া ফটোকার্ডগুলোর মধ্যে অন্তত দুইটিতে ওই আসল ফটোকার্ডের ছবি, শ্যাডো ও কিছু গ্রাফিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিদ্যমান ডিজাইন পরিবর্তন করে নতুন ভুয়া তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।
আনভীর গ্রেফতারের দাবির সত্যতা কী?
ভাইরাল ফটোকার্ডগুলোর অন্যতম দাবি ছিল, বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর গ্রেফতার হয়েছেন।
রিউমর স্ক্যানারের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনা ঘটলে তা শুধু কালের কণ্ঠ নয়, দেশের অন্যান্য মূলধারার গণমাধ্যমেও গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হতো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালিয়েও এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ফলে আনভীর গ্রেফতারের দাবিকে ভুয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষমা চাওয়া ও কালের কণ্ঠ বন্ধ হওয়ার দাবিরও মিলেনি প্রমাণ
ভাইরাল ফটোকার্ডে কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ হাসনাত আব্দুল্লাহর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে এবং পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন দাবিও করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্য কোনো গণমাধ্যমেও এমন কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ফলে এসব দাবিও ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
ভুয়া ফটোকার্ড নিয়ে জিডি
ঘটনার পর ২৯ জুন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন কালের কণ্ঠ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনের নাম, লোগো ও ডিজাইন নকল করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি ও প্রচারের অভিযোগে ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনে।
বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্তে সতর্ক থাকার আহ্বান
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ হওয়ায় বর্তমানে গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন নকল করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হয়ে গেছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো ফটোকার্ড দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, কোনো তথ্য বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ বা নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কালের কণ্ঠ ভুয়া ফটোকার্ড-এ থাকা সায়েম সোবহান আনভীরের গ্রেফতার, কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া এবং পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবিগুলোর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এগুলো কালের কণ্ঠের প্রকৃত প্রকাশনা নয়; বরং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের ডিজাইন নকল করে তৈরি করা ভুয়া ফটোকার্ড।





