ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী। ৫ ইসলামী ব্যাংকের আমানত সুরক্ষা ও অর্থ ফেরতের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন এবং জনগণের সম্পদ লুটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান।
বাজেট আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত ধারা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল ১৮(ক) ধারা
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে গত ১০ এপ্রিল আইনে পরিণত করে বিএনপি সরকার। আইনটি সংসদে পাস হওয়ার আগে নতুন করে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।
এই ধারার বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা ওই ব্যাংকের শেয়ারধারী ছিলেন, তাঁরা চাইলে পরবর্তীতে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায়ভার গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারতেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এমন সুযোগ দিতে পারত।
ধারাটি যুক্ত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতেই এ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ১৮(ক) ধারা বাতিলের কারণ
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী,

অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনার পর সরকার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, আইনটির এই ধারা বাদ দেওয়া হবে।
তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে ব্যাংকিং খাতে জনআস্থা পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা বিধানটি প্রত্যাহারের পথে এগোচ্ছে সরকার।
তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য কী সুবিধা
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের রূপরেখাও তুলে ধরেন।
তার মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি হিসাব ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন।
অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। সরকার এ প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশেষ মানবিক সুবিধা
কিছু বিশেষ শ্রেণির গ্রাহকের জন্য অতিরিক্ত মানবিক সুবিধার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন—
- ক্যানসার রোগী
- কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী
- হজ সঞ্চয়কারী
- ডিপিএস গ্রাহক
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ
বাজেট আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের বিষয়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থ বিলে একগুচ্ছ সংশোধনী আনা হচ্ছে, যার লক্ষ্য বাজারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা
- তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ছাড়
- ব্যাংকিং চ্যানেলে সব লেনদেন সম্পন্ন করা কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর সুবিধা
- লভ্যাংশের ওপর করহার কমানো
এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডে কর রেয়াত পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকারের উদ্যোগ
অর্থমন্ত্রী সংসদে জানান, গত মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ পাঠানো হয়েছে।
পাশাপাশি বড় ঋণগ্রহীতা ছয়টি গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রথম ধাপে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির লক্ষ্য
সরকার অর্থনীতিকে ঋণনির্ভর কাঠামো থেকে বিনিয়োগনির্ভর কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিতে চায় বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
কর হ্রাস ও বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর
অর্থমন্ত্রী জানান, ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ব্যবসা সহজ করতে ডিরেগুলেশন, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
সরকার মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে। একই সঙ্গে একীভূত ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ফেরতের রূপরেখা, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা দেশের আর্থিক খাত সংস্কারের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।





