সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যা মামলায় ১০ দিন পর উদ্ধার হয় শাহরিয়ার আহমেদের লাশ। মুক্তিপণ দাবির পেছনের ভয়াবহ ঘটনার বিস্তারিত জানুন।
সাইপ্রাসের লারনাকা শহরে নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিন পর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহমেদ (ইমন)-এর লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পরও তাঁর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছিল। পুলিশ ইতোমধ্যে এ ঘটনায় এক বাংলাদেশি তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লাশ ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করেছে।
সাইপ্রাসে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার লোচনপুর গ্রামের বাসিন্দা শাহরিয়ার আহমেদ ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। প্রায় তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে যান তিনি। দেশেই অনলাইনের মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগরীয় দেশটিতে পাড়ি জমান।

সাইপ্রাসের লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় বসবাস করতেন শাহরিয়ার। পরিবারের সদস্যদের মতে, সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি চাকরি খুঁজছিলেন তিনি, যাতে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমানো যায়।
নিখোঁজ হওয়ার আগে শেষ কথোপকথন
১১ জুন বিকেলে মায়ের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন শাহরিয়ার। তিনি জানান, একটি নাইট শিফটের চাকরি পেয়েছেন এবং সেদিন রাতেই কাজে যোগ দেবেন।
একই তথ্য তিনি গ্রিসপ্রবাসী বাবা নাসির মিয়া এবং রুমমেট রায়হান মিয়াকেও জানান। কাজের স্থানে পৌঁছে স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রায়হানের কাছে নিজের অবস্থানের লোকেশন পাঠান।
এর কিছুক্ষণ পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা: মুক্তিপণ দাবির ভয়াবহ ঘটনা
রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে তাঁর বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে দাবি করা হয়, শাহরিয়ারকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তাঁকে জীবিত ফেরত পেতে হলে ৩৫ হাজার ইউরো মুক্তিপণ দিতে হবে।
বার্তায় আরও হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে টাকা না দিলে তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেওয়া হবে।
প্রথমদিকে পরিবার মনে করেছিল, হয়তো হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। কিন্তু পরদিন সকালেও শাহরিয়ার কাজে থেকে ফিরে না আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
রুমমেট রায়হান মিয়া দ্রুত স্থানীয় পুলিশকে বিষয়টি জানান। পুলিশ তাঁর পাঠানো সর্বশেষ লোকেশন অনুসরণ করেও কোনো সন্ধান পায়নি।
প্রতিদিনই চলছিল মুক্তিপণ দাবি
পরিবারের সদস্যরা জানান, শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ২৪ ঘণ্টাই সক্রিয় ছিল। প্রতিদিন যোগাযোগ করে টাকা দাবি করা হচ্ছিল।
শাহরিয়ারের ভাই নয়ন আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাইকে উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ায় একপর্যায়ে পরিবার মুক্তিপণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দর-কষাকষির পর পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতার কথাও হয়।
রোববার টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংকে গেলেও তারা একবারের জন্য শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু অপর পক্ষ তাতে সম্মত হয়নি। পরে টাকা পাঠানো স্থগিত রেখে বাড়ি ফিরে আসে পরিবার।
সেই দিন রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে সাইপ্রাস পুলিশ শাহরিয়ারের লাশ উদ্ধার করেছে।
গ্রেপ্তার বাংলাদেশি তরুণ
সাইপ্রাস পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শাহরিয়ার আহমেদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শাহীন বাবু নামের ২২ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বজনদের দাবি, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোফিনু এলাকার একটি স্থান থেকে মাটিচাপা দেওয়া গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া শাহীন বাবুর বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা বা তিনি কোন জেলার বাসিন্দা—সেই তথ্য পুলিশ প্রকাশ করেনি।
পুলিশের তদন্তে যা জানা গেছে
নিহতের স্বজনেরা সাইপ্রাস পুলিশের বরাত দিয়ে জানান, ১১ জুন রাতেই শাহরিয়ারকে হত্যা করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করার পর মরদেহ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়। পরে তাঁর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হতে থাকে।
পুলিশ শাহরিয়ারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করার পর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। এরপর সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়।
মায়ের কান্না, পরিবারের বিচার দাবি
ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর ভেঙে পড়েছেন শাহরিয়ারের মা পাপিয়া বেগম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তাঁর সন্তানকে যারা হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান। পাশাপাশি ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।
পরিবারের সদস্যরাও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানিয়েছেন, সাইপ্রাসে অধ্যয়নরত রায়পুরার এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধারের খবর তিনি পেয়েছেন।
তবে এখন পর্যন্ত সাইপ্রাসের দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নিহতের পরিবার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাইলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রবাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনা বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নতুন দেশে গিয়ে কাজ ও পড়াশোনার সমন্বয় করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হন।
সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।





