সৌদিতে প্রবাসীরা পাসপোর্ট নিয়ে মহাযন্ত্রণায়। দীর্ঘ অপেক্ষা, দালালচক্রের অভিযোগ ও লোকবল সংকটে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা পড়েছেন কঠিন দুর্ভোগে।
সৌদিতে প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন সংকট এখন দেশটির বাংলাদেশি প্রবাসীদের অন্যতম বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল অফিসে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে হাজারো প্রবাসী দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে দালালচক্রের সক্রিয়তা, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট এবং দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স উৎস। অথচ সেই দেশের বাংলাদেশি কর্মীরাই বর্তমানে পাসপোর্ট নবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সৌদিতে প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন সংকট কেন বাড়ছে?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটের সামনে প্রতিদিন শত শত প্রবাসী লাইনে অপেক্ষা করেন। অনেকের অভিযোগ, বৈধ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে বায়োমেট্রিকের জন্য চার থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এরপর পাসপোর্ট হাতে পেতে আরও দুই থেকে পাঁচ মাস লেগে যায়।
এদিকে একই সময়ে কিছু ব্যক্তি অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কয়েক দিনের মধ্যেই বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব দালাল নিয়মিত দূতাবাসের আশপাশে ঘোরাফেরা করেন এবং অনলাইনেও গ্রাহক সংগ্রহ করেন।
দালালচক্রের সক্রিয়তা নিয়ে কী পাওয়া গেছে?
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দালালরা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজের মাধ্যমে দ্রুত পাসপোর্ট সেবা দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।

তাদের প্রচারণায় বলা হচ্ছে—
- এক দিনের মধ্যে বায়োমেট্রিক
- আগে কাজ, পরে টাকা
- পাসপোর্ট সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান
অনুসন্ধানী টিম গ্রাহক সেজে যোগাযোগ করলে একাধিক ব্যক্তি ২৫০ থেকে ৩০০ সৌদি রিয়ালের বিনিময়ে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বায়োমেট্রিকের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। এমনকি কাজের আগে আংশিক অর্থ নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা
রিয়াদে অবস্থানরত শরিফ মল্লিক জানান, লাইনে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণ পরই একজন ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে ৩৫০ রিয়ালের বিনিময়ে দুই ঘণ্টার মধ্যে বায়োমেট্রিক করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
জেদ্দায় কর্মরত শাহ আলম বলেন, অনেক গ্রাহক দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করলেও কিছু মানুষ সরাসরি অফিস কক্ষে গিয়ে দ্রুত বায়োমেট্রিক দিয়ে বের হয়ে আসেন।
রিয়াদের বাসিন্দা মাসুদ রানা জানান, তিনি মে মাসে আবেদন করলেও সাক্ষাৎকারের তারিখ পেয়েছেন সেপ্টেম্বরে। অথচ তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন প্রয়োজন ছিল। পরে একজন দালাল ৪০০ রিয়ালের বিনিময়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জেদ্দার এক প্রবাসী জানান, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে বাধ্য হয়ে তিনি ৩০০ রিয়াল দিয়ে দালালের মাধ্যমে এক দিনের মধ্যেই বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করেন।
সৌদিতে প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন সংকটের প্রভাব
এই সৌদিতে প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে স্বল্প আয়ের কর্মীদের ওপর।
সৌদি আরবে বৈধভাবে কাজ করতে আকামা (রেসিডেন্স পারমিট) নবায়নের জন্য বৈধ পাসপোর্ট প্রয়োজন। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আকামা নবায়নও জটিল হয়ে পড়ে।
অনেক শ্রমিককে শত শত কিলোমিটার দূর থেকে দূতাবাস বা সেবা কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। এতে কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দিনের মজুরিও কাটা যাচ্ছে।
দাম্মামের নির্মাণশ্রমিক বেলাল মিয়া বলেন, দুই-তিনবার গিয়ে কাজ না হলে তাঁদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। তিনি অভিযোগ করেন, দূতাবাসে প্রবাসীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হয় না।
এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের প্রভাব
দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, আগে প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব হলেও বর্তমানে মাসে মাত্র প্রায় ছয় হাজার আবেদন নেওয়া যাচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে বিদেশি মিশনে এমআরপি কার্যক্রম বন্ধ করে ধাপে ধাপে ই-পাসপোর্ট চালু করা হয়। তবে এই পরিবর্তনের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
ফলে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার আবেদনকারী নিয়মিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, এটি প্রবাসী কর্মীদের প্রতি এক ধরনের অবিচার।
তাঁর মতে, সংকটের মূল কারণগুলো হলো—
- এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের আগে পর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভাব।
- প্রয়োজনীয় জনবল ও বায়োমেট্রিক কিটের সংকট।
- আবেদন গ্রহণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পাসপোর্ট সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ অথবা বিশেষ টিম পাঠিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান।
সরকার কী বলছে?
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় মোবাইল ইউনিট ও বায়োমেট্রিক কিটের সংকটের কারণে ই-পাসপোর্ট সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
দূতাবাসের কর্মকর্তারাও অনানুষ্ঠানিকভাবে জনবল, যন্ত্রপাতি এবং সার্ভার সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার ফয়সল হাসান বলেন, যেসব দেশে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, সেখানে বিশেষ টিম পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সৌদিতে নতুন টিম পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ) এ টি এম আবু আসাদ জানান, সৌদি আরবে লোকবল সংকটের কারণে বিদ্যমান যন্ত্রপাতির পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, পাসপোর্ট নবায়নের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
- ২০২৬ সালের মে মাসে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫৪৬.৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।
- এপ্রিলে এসেছে প্রায় ৫২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
- ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
- পুরো অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৩০ শতাংশ বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন সৌদিতে প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন সংকট চলতে থাকলে তা ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌদি আরবে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির জন্য পাসপোর্ট শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং বৈধভাবে কাজ, আকামা নবায়ন এবং জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান নথি। দীর্ঘসূত্রতা, দালালচক্রের অভিযোগ, জনবল সংকট এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তৈরি হওয়া বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে প্রবাসীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপই এই সংকট নিরসনের প্রধান প্রত্যাশা।





