ইনফান্তিনো কি ৬৪ দলের বিশ্বকাপ বাস্তবায়ন করতে পারবেন, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে ফিফায় নতুন আলোচনা। ২০৩০ সালে এই ঐতিহাসিক আসর বাস্তবায়নে ফরম্যাট, দল ও নেতৃত্ব—সবই বড় প্রশ্ন।
৩৯ দিনের মহোৎসব শেষে স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপকে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে সফলই বলা যায়। তবে আসর শেষ হওয়ার পর এখন আলোচনায় নতুন পরিকল্পনা—ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কি ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবেন?
বর্তমানে ফিফা সভাপতির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এর পেছনে রয়েছে বেশি দেশকে সুযোগ দেওয়া, আরও ম্যাচ আয়োজন এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়ানোর চিন্তা। তবে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু ফরম্যাট পরিবর্তন করলেই হবে না; প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক সমর্থন, ফিফার ভেতরে ঐকমত্য এবং ইনফান্তিনোর নিজের নেতৃত্বের অবস্থান শক্ত করা।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ কেন চান ইনফান্তিনো?

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দর্শন অনেকটাই সরল—অংশগ্রহণ যত বেশি, সুযোগও তত বেশি। তাঁর মতে, ছোট দেশগুলোকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দিলে তারা ফুটবলের উন্নয়নে আগ্রহ হারাতে পারে।
এই চিন্তা থেকেই ৩২ দলের বিশ্বকাপ থেকে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পথে গেছে ফিফা। এখন সেই সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ৬৪ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ইনফান্তিনোর যুক্তি হলো, বেশি দল অংশ নিলে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের বিস্তার আরও বাড়বে।
তবে শুধু অংশগ্রহণের সুযোগ নয়, অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। বেশি দল মানে বেশি ম্যাচ। আর বেশি ম্যাচ মানে সম্প্রচার, বাণিজ্যিক অধিকার ও অন্যান্য আয়ের সুযোগও বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে ৪৮ দলের ফরম্যাট নিয়ে অনেক আলোচনা থাকলেও মাঠের লড়াইকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায়নি। অনেক ম্যাচেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে দল বাড়লেই প্রতিযোগিতার মান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে—এমন ধারণার পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণও নেই।
২০৩০ বিশ্বকাপ ঘিরেই কি বড় পরিবর্তন?
২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শততম বছর উদ্যাপন করা হবে। সেই আসর আয়োজন করবে ছয় দেশ—ইউরোপের পর্তুগাল ও স্পেন, আফ্রিকার মরক্কো এবং লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে।
এত বড় পরিসরে আয়োজিত বিশ্বকাপকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ানোর আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন মহাদেশকে আরও বেশি ম্যাচ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চাপ বাড়তে পারে।
প্রথম প্রস্তাবটি অবশ্য ফিফার কাছ থেকে আসেনি। লাতিন আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবলের পক্ষ থেকেই ৬৪ দলের বিশ্বকাপের ধারণা সামনে আসে। ২০২৫ সালের এপ্রিলেই তারা এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল।
লাতিন আমেরিকায় ২০৩০ বিশ্বকাপে যে সংখ্যক ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতে কনমেবল পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। ৬৪ দলের ফরম্যাট হলে অতিরিক্ত ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ হলে কী বদলাবে?
ফরম্যাটের দিক থেকে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করা খুব জটিল নাও হতে পারে। ১৬টি গ্রুপে চারটি করে দল রাখা হলে মোট ৬৪ দলকে সহজেই ভাগ করা সম্ভব। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল পরের পর্বে উঠলে শেষ ৩২-এর নকআউট পর্ব শুরু করা যাবে।
এতে বর্তমান ৪৮ দলের ফরম্যাটের একটি সমস্যার সমাধানও হতে পারে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে থাকা কিছু দল পরের পর্বে যাওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে সেরা তৃতীয় দল বাছাইয়ের হিসাব তৈরি হয়।
৬৪ দলের বিশ্বকাপে ১৬ গ্রুপ থেকে সরাসরি শীর্ষ দুই দলকে নিয়ে শেষ ৩২-এর পর্ব আয়োজন করা সম্ভব। ফলে তৃতীয় স্থানে থাকা দলের হিসাব করতে হবে না।
এটি ফরম্যাটকে তুলনামূলকভাবে সহজ ও সরল করতে পারে। দর্শক ও দল—উভয়ের জন্যই গ্রুপ পর্বের হিসাব আরও পরিষ্কার হবে।
নতুন ১৬ দল কি বিশ্বকাপের মান কমাবে?
৬৪ দলের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—নতুন ১৬ দল যোগ হলে প্রতিযোগিতার মান কতটা বজায় থাকবে?
তবে সাম্প্রতিক বাছাইপর্বের দিকে তাকালে বিষয়টি একেবারে একপাক্ষিক নয়। ইতালি, ডেনমার্ক, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, সার্বিয়া, ওয়েলস ও পোল্যান্ডের মতো দল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি।
অন্যদিকে, কুরাসাও ও কেপ ভার্দের মতো দল প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে চমক দেখিয়েছে। ফলে নতুন ও অভিজ্ঞ দল মিলিয়ে আরও ১৬টি দল যোগ হলে প্রতিযোগিতায় একেবারেই মান থাকবে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু দল বাড়ালেই হবে না। নতুন দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা এবং মহাদেশভিত্তিক বাছাইয়ের মানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এশিয়া ও আফ্রিকার পারফরম্যান্সে বড় পার্থক্য
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে মহাদেশভিত্তিক পারফরম্যান্সের পার্থক্যও আলোচনায় এসেছে। আফ্রিকা থেকে অংশ নেওয়া ১০ দলের মধ্যে ৯টি পরের পর্বে উঠেছে।
অন্যদিকে, এশিয়ার ৯ দলের মধ্যে মাত্র ২টি দল পরের পর্বে জায়গা করে নিতে পেরেছে। সেই দুই দল ছিল অস্ট্রেলিয়া ও জাপান।
এশিয়ার দলগুলোর এই পারফরম্যান্স নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৬৪ দলের বিশ্বকাপ হলে আরও বেশি দলকে সুযোগ দেওয়া সম্ভব হলেও সব মহাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সমান নয়।
তাই ফিফার সামনে শুধু দল বাড়ানোর প্রশ্ন নয়, বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটবল উন্নয়নের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে ৬৪ দল কি অসম্ভব?
ফিফার অধীনে রয়েছে ২১১টি সদস্য দেশ। সেই জায়গা থেকে ৬৪টি দল নিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনকে সংখ্যাগতভাবে অসম্ভব বলা যায় না।
বরং বর্তমান বিশ্বের ফুটবল বিস্তারের বাস্তবতায় আরও বেশি দেশকে বিশ্বকাপে সুযোগ দেওয়ার যুক্তি রয়েছে। তবে মূল সমস্যা হতে পারে টুর্নামেন্টের দৈর্ঘ্য, আয়োজক দেশের ওপর চাপ এবং ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক মান বজায় রাখা।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের ৩৯ দিনের আয়োজনই দেখিয়েছে, বড় টুর্নামেন্ট পরিচালনা কতটা ব্যাপক হতে পারে। ৬৪ দলের আসর হলে ম্যাচের সংখ্যা ও সাংগঠনিক দায়িত্ব আরও বাড়বে।
তবে ফরম্যাট ঠিকভাবে সাজানো গেলে এটি বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে। ১৬ গ্রুপ ও শেষ ৩২-এর কাঠামো সেই সম্ভাবনার একটি পথ দেখাচ্ছে।
ইনফান্তিনোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নেতৃত্বের রাজনীতি
৬৪ দলের বিশ্বকাপ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো ফরম্যাট নয়, বরং ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।
সাম্প্রতিক সময়ে ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড বিতর্ক এবং মাঠে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খবরদারি নিয়ে ইনফান্তিনো ইউরোপের অনেকের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এর ফলে সামনের নির্বাচনে উয়েফাকে তাঁর পাশে পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে আলোচনায় এসেছে।
ফিফা সভাপতির পদে নিজের অবস্থান শক্ত না করতে পারলে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের মতো বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, এমন সিদ্ধান্তের জন্য শুধু সভাপতির ইচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ফিফার সদস্য ফেডারেশনগুলোর সমর্থন।
তাই ৬৪ দলের বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের অবস্থান এবং ফিফার অভ্যন্তরীণ সমর্থনের ওপর।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ এখনো বাস্তবায়িত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি একটি পরিকল্পনা ও প্রস্তাব, যার পক্ষে যেমন যুক্তি রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমালোচনাও।
সমর্থকদের মতে, আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপে সুযোগ পেলে ফুটবলের বৈশ্বিক বিস্তার বাড়বে। নতুন দলগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত দল যোগ হলে বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতামূলক মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে খুব বেশি সম্প্রসারণ করলে এর বিশেষত্বও কমে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ফিফার সদস্য দেশগুলোর অবস্থান, বিভিন্ন মহাদেশীয় ফেডারেশনের সমর্থন এবং জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তার উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ফরম্যাটের দিক থেকে ১৬ গ্রুপে ৬৪ দল এবং শীর্ষ দুই দল নিয়ে শেষ ৩২-এর কাঠামো একটি বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তবে ফুটবলের মান, আয়োজনের চাপ এবং ফিফার অভ্যন্তরীণ সমর্থন—এই তিনটি বিষয়ই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইনফান্তিনো যদি নিজের নেতৃত্বের অবস্থান শক্ত করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায় করতে পারেন, তাহলে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে পারে। অন্যথায় এটি আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।





