আরও খবর

News Photocard (30)
২০২৬ সালের প্রাদেশিক উপনির্বাচন: অন্টারিও এনডিপির হয়ে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনটি ধরে রাখলেন শাবান
News Photocard (27)
নতুন দায়িত্ব পেলেন মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
News Photocard (24)
পে স্কেল বাস্তবায়নে বাড়তি টাকার সংস্থান যেভাবে
News Photocard (9)
বাংলাদেশসহ ৩১ দেশের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা সীমিত করল মালয়েশিয়া
News Photocard (16)
প্রধানমন্ত্রী এখনো এক-এগারোর নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন, প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে নতুন মডেলে কাজ শুরু: অর্থমন্ত্রী

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। তিন বছরের পিপিপি মডেলে পানি সরবরাহে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলো।

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট কমাতে নতুন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মডেলে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লুতে এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, নগরের উত্তর ও দক্ষিণ পতেঙ্গার ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পানি সরবরাহের মান বাড়ানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের একটি বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। নতুন এই মডেলে চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করবে। তিন বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে।

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় পাইলট প্রকল্প

অর্থমন্ত্রী বলেন,

নগরবাসীর দোরগোড়ায় পরিষ্কার ও নিরাপদ খাবার পানি পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সেই লক্ষ্যেই নগরের প্রান্তিক এলাকায় নতুন পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সরকার একা সব মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীদারকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নতুন উদ্যোগে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন, ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা একসঙ্গে কাজ করবে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পানি সংকট মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে কেন এই উদ্যোগ

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডকে পাইলট প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ধাপে এই দুই ওয়ার্ডের পানির চাহিদা নিরূপণ করা হবে। এরপর সেই চাহিদার ভিত্তিতে উদ্ভাবনী পানি সরবরাহ মডেল পরীক্ষা করা হবে।

চলতি বছরের মে মাসে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের পরিচালিত এক সমীক্ষার পর এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ খাবার পানি পাওয়ার সুযোগ সীমিত। ওই দুই ওয়ার্ডের মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক পৌঁছেছে।

ফলে বিপুলসংখ্যক বাসিন্দাকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বেসরকারি ভেন্ডরের পানি কিনছেন বাসিন্দারা

সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দুই ওয়ার্ডের অধিকাংশ বাসিন্দা বর্তমানে এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৮৫ থেকে ১১০টি বেসরকারি ভেন্ডরের কাছ থেকে প্রতিদিন পানি কিনছেন।

প্রতিদিন জনপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ লিটার পানি কিনতে তাদের ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পাইপলাইনভিত্তিক নিরাপদ পানি সরবরাহের সীমিত সুযোগের কারণে অনেক বাসিন্দাকেই নিয়মিতভাবে বেসরকারি উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রাও বেশি

পানি সংকটের পাশাপাশি দুই ওয়ার্ডে ভূগর্ভস্থ পানির মান নিয়েও উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে সমীক্ষায়।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ওই এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি অত্যন্ত লবণাক্ত। পরীক্ষায় পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা সর্বোচ্চ ৩ হাজার পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। জাতীয় নিরাপদ সীমা হিসেবে সমীক্ষায় ১ হাজার পিপিএমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় নিরাপদ খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প ও কার্যকর ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তিন প্রতিষ্ঠানের তিন বছরের সমঝোতা

চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মধ্যে তিন বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।

চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠান তিনটি যৌথভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য একটি উদ্ভাবনী সরকারি-বেসরকারি পানি সরবরাহ মডেল অনুসন্ধান ও পরীক্ষা করবে।

এই সহযোগিতার সূচনা হবে ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানির চাহিদা নিরূপণ এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার সঙ্গে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের এ ধরনের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের পানি সরবরাহ খাতে এটি নতুন ধরনের উদ্যোগের সূচনা।

অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত ছিলেন

শুক্রবার সকালে হোটেল রেডিসন ব্লুর একটি হলরুমে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন এবং বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ইয়ান ভ্যান ডার লিন্ডেন উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জনগণের পক্ষে ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানি সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন ইসরাফিল খসরু।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ুবিষয়ক প্রথম সচিব ইজে ক্রুজেন সমঝোতা স্মারকের সাক্ষী ছিলেন।

এই উদ্যোগে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, পানি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ পানি তাদের বাংলাদেশে সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে।

পিপিপি মডেলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্য

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। সরকারের পক্ষে সব কাজ একা করা সম্ভব নয়। তাই সরকারি সেবা মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ব্যবহার বাড়ানোর কথা তুলে ধরেন তিনি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন অর্থনৈতিক মডেলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত অর্থায়নে অংশ নেবে এবং এনজিওগুলো সহযোগিতা করবে। এর মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

তিনি বিশেষভাবে রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন অবকাঠামো বা সেবা ব্যবস্থা তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। নতুন অংশীদারিত্বের মডেলে এই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পানি সরবরাহের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা

নতুন প্রকল্প শুধু বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বর্ষাকালে চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশনের সমস্যাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান তিনি।

এ বিষয়ে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থাৎ, পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের পাশাপাশি নগরের পানি ব্যবস্থাপনার আরও বিস্তৃত বিষয় নিয়ে কাজ করার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়ে সামনে কী

৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে শুরু হওয়া পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে স্থানীয় পানির চাহিদা ও বিদ্যমান সরবরাহ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। এরপর অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন পানি সরবরাহ মডেল পরীক্ষা করবে।

সমীক্ষায় পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সীমিত বিস্তার, বেসরকারি ভেন্ডরের ওপর নির্ভরতা এবং ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চ লবণাক্ততার যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এনেছে।

তবে প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার সামঞ্জস্যের ওপর।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে নতুন দৃষ্টান্ত

চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের এই সহযোগিতাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলাদেশের পানি সরবরাহ খাতে নতুন দিকনির্দেশনার সূচনা হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসের সরকারি তথ্যেও বাংলাদেশে পানি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত বিষয়ে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে পতেঙ্গার দুই ওয়ার্ডে শুরু হওয়া পাইলট প্রকল্পটি স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ পানি সরবরাহের একটি নতুন মডেল পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট কমাতে ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে শুরু হওয়া নতুন পিপিপি উদ্যোগটি মূলত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তিন বছরের সমঝোতার মাধ্যমে চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করবে।

সমীক্ষায় পাওয়া সীমিত পাইপলাইন সুবিধা, বেসরকারি বিক্রেতার ওপর নির্ভরতা এবং ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততার তথ্যের ভিত্তিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন পাইলট প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে মডেলটি কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সর্বাধিক পঠিত