শিয়ালকোটের ফুটবল কারখানা থেকে বিশ্বের ৭০% ফুটবল তৈরি হয়। বিশ্বকাপের ট্রাইওন্ডাসহ নানা বল তৈরিতে পাকিস্তানের এই শহরের বড় ভূমিকা রয়েছে।
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। মাঠে খেলোয়াড়দের পায়ে যে বলটি ঘুরে বেড়ায়, তার বড় একটি অংশের উৎপত্তি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট শহরে। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ফুটবল তৈরি হয় এই শহরে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে শিয়ালকোট পরিচিত হয়ে উঠেছে বিশ্বের ‘ফুটবল কারখানা’ হিসেবে।
শুধু সাধারণ ফুটবল নয়, বিশ্বকাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক আসরের বল তৈরিতেও শহরটির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৮২ সাল থেকে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল তৈরির সঙ্গে শিয়ালকোটের কারখানাগুলো যুক্ত। সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ও তৈরি হয়েছে এই শহরের কারখানায়।
শিয়ালকোটের ফুটবল কারখানার ইতিহাস

শিয়ালকোটে ফুটবল তৈরির ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবল মেরামতের কাজ দিয়ে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট পরিসরের কাজ ধীরে ধীরে বড় একটি উৎপাদনশিল্পে রূপ নেয়।
বর্তমানে শিয়ালকোটের বিভিন্ন কারখানা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ফুটবল বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানি করা হয়। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে বছরে প্রায় চার কোটি ফুটবল রপ্তানি হয়। এর বড় একটি অংশ আসে শিয়ালকোট থেকে।
ফুটবল উৎপাদনে শহরটির এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক বাজারেও এর অবস্থান শক্ত করেছে। স্থানীয় দক্ষ কারিগরদের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।
হাতে তৈরি বলেই শিয়ালকোটের বিশেষত্ব
শিয়ালকোটের ফুটবল উৎপাদনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দক্ষ কারিগরদের হাতের কাজ। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও অনেক ফুটবল এখনো অভিজ্ঞ কারিগররা হাতে সেলাই করেন।
একজন দক্ষ কারিগর দিনে প্রায় চারটি ফুটবল সেলাই করতে পারেন। তবে একটি ফুটবল নিখুঁতভাবে তৈরি করা সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, ধৈর্য এবং বছরের পর বছর অর্জন করা অভিজ্ঞতা।
ফুটবলের প্রতিটি অংশ সঠিকভাবে প্রস্তুত করা এবং সেলাইয়ের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বলের গঠন সামান্য এদিক-সেদিক হলেও মাঠে এর কার্যকারিতায় প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বকাপের বল তৈরিতে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ
বিশ্বকাপের ম্যাচ বল তৈরির ক্ষেত্রে শিয়ালকোটের কারখানাগুলোকে আরও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বলের আকৃতি, ওজন, আকার, সেলাই এবং মাঠে এর কার্যকারিতা—সবকিছু পরীক্ষা করা হয়।
একটি নতুন বিশ্বকাপের বল তৈরি ও পরীক্ষা করার পেছনে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের মাঠে কোনো বল গড়ানোর অনেক আগেই সেটির নকশা, উৎপাদন ও পরীক্ষার কাজ শুরু হয়।
ফুটবল উৎপাদনে প্রযুক্তির পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। FIFA-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিয়ালকোট অঞ্চলে FIFA-সনদপ্রাপ্ত ফুটবলের প্রায় অর্ধেক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং শহরটির উৎপাদনকারীরা বিশ্বব্যাপী ফুটবলের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফরোয়ার্ড স্পোর্টসের সঙ্গে বিশ্বকাপের বলের ইতিহাস
শিয়ালকোটের ‘ফরোয়ার্ড স্পোর্টস’ বিশ্বকাপের বল তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বকাপের একাধিক প্রজন্মের বল তৈরির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম যুক্ত রয়েছে।
২০১৪ সালের ব্রাজুকা, ২০১৮ সালের টেলস্টার, ২০২২ সালের আল রিহলা এবং ২০২৬ সালের ট্রাইওন্ডা—এই চার বিশ্বকাপের বল তৈরির সঙ্গে ফরোয়ার্ড স্পোর্টসের নাম জড়িয়ে আছে।
এর ফলে বিশ্বকাপের মতো সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের বল উৎপাদনের ক্ষেত্রে শিয়ালকোটের সক্ষমতার বিষয়টি আরও সামনে এসেছে।
পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহারের উদ্যোগ
শিয়ালকোট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শেখ জোহাইব রফিক শেঠি ২০২২ সালে জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের বল শিয়ালকোটে তৈরি হওয়ায় শহরটির মর্যাদা আরও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেছিলেন, বিশ্বকাপের বল তৈরির ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব উপাদান এবং পানিভিত্তিক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।
এতে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবল উৎপাদনে শুধু মানের বিষয় নয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উপাদান নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, সাধারণ ফুটবলেরও বড় সরবরাহকারী
শিয়ালকোটের উৎপাদিত ফুটবল কেবল বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের জন্য ব্যবহৃত হয় না। শহরটির কারখানাগুলোতে ক্লাব, স্কুল, একাডেমি এবং সাধারণ খেলোয়াড়দের ব্যবহারের জন্যও ফুটবল তৈরি হয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের লোগোযুক্ত বলও শিয়ালকোটের কারখানায় তৈরি করিয়ে নেয়।
ফলে শহরটির ফুটবল শিল্পের বাজার শুধু বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত ফুটবল থেকেও এর উৎপাদন কার্যক্রম বিস্তৃত।
কেন শিয়ালকোটকে ‘ফুটবল কারখানা’ বলা হয়?
বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ফুটবল তৈরি হওয়ার বিষয়টি শিয়ালকোটের শিল্পভিত্তিক পরিচয়কে বিশেষ করে তুলেছে। এক শতাব্দীর বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা, দক্ষ কারিগর, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য উৎপাদন এবং বিশ্বকাপের বল তৈরির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক—সব মিলিয়ে শহরটি ফুটবল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
একদিকে যেমন আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জায়গা করে নিয়েছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতের কাজও এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের সমন্বয় শিয়ালকোটের ফুটবল শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিশ্বকাপের ম্যাচ বলের ক্ষেত্রে আবার মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বল মাঠে কেমন আচরণ করবে, তার আকার ও ওজন ঠিক আছে কি না এবং উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়।
ফুটবলের নেপথ্যে শিয়ালকোটের হাজারো হাত
ফুটবলপ্রেমীরা সাধারণত স্টেডিয়ামের আলো, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স কিংবা গোলের মুহূর্ত নিয়েই বেশি আগ্রহী থাকেন। কিন্তু সেই ফুটবল তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং অসংখ্য মানুষের শ্রম।
শিয়ালকোটের কারখানাগুলোতে তৈরি বল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। বিশ্বকাপের বড় মঞ্চ থেকে শুরু করে স্থানীয় স্কুল, ক্লাব ও ছোট মাঠ—বিভিন্ন পর্যায়ের খেলায় ব্যবহৃত ফুটবলের সঙ্গে এই শহরের কারিগরদের শ্রম যুক্ত রয়েছে।
এ কারণেই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে শিয়ালকোট হয়তো পরিচিত কোনো স্টেডিয়াম বা দলীয় নাম নয়, কিন্তু ফুটবল উৎপাদনের জগতে শহরটির গুরুত্ব অনেক বড়।
শিয়ালকোটের ফুটবল কারখানার বৈশ্বিক গুরুত্ব
শিয়ালকোটের গল্প মূলত একটি শিল্পের দীর্ঘ বিবর্তনের গল্প। স্থানীয়ভাবে ফুটবল মেরামতের কাজ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের ম্যাচ বল তৈরির পর্যায়ে পৌঁছেছে এই শহরের শিল্প।
প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফুটবল উৎপাদন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা রপ্তানির মাধ্যমে শিয়ালকোট আন্তর্জাতিক ফুটবল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপের ২০২৬ আসরের ‘ট্রাইওন্ডা’ও এই শহরে তৈরি হওয়ায় শিয়ালকোটের দীর্ঘ ফুটবল-শিল্প ইতিহাসে নতুন আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।
ফুটবল মাঠে গড়ানোর আগে যে শহরের বহু মানুষের শ্রমের মধ্য দিয়ে বলটি প্রস্তুত হয়, সেই শিয়ালকোট তাই ফুটবলের নেপথ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। স্টেডিয়ামের দর্শক হয়তো বলটির উৎপত্তিস্থল জানেন না, কিন্তু বিশ্বের ফুটবল শিল্পে এই শহরের অবদান সুস্পষ্ট।
শিয়ালকোট শুধু পাকিস্তানের একটি শিল্পশহর নয়; ফুটবল তৈরির ক্ষেত্রে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত একটি কেন্দ্র। এক শতাব্দীর বেশি সময়ের ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগর, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশ্বকাপের বল তৈরির অভিজ্ঞতা শহরটিকে বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের ঝলমলে স্টেডিয়াম কিংবা পাড়ার ছোট মাঠ—অসংখ্য ফুটবলের যাত্রা শুরু হয় পাকিস্তানের এই শহরের কারখানা থেকেই। সেই অর্থে, মাঠের উত্তেজনার আড়ালে শিয়ালকোটের শ্রম ও দক্ষতার গল্পও ফুটবলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।





