ট্রাম্পের ওপর খেপেছেন সাংবাদিকরা, ৮ জুলাই আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় গোপনে বিমান বদল করে তাদের ঝুঁকিতে রাখার অভিযোগ উঠেছে হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রাম্পের বিমান বদল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কয়েকজন। ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় ইরানের সম্ভাব্য মিসাইল হামলার হুমকির মধ্যে ট্রাম্প গোপনে একটি নিরাপদ ছোট সামরিক বিমানে চলে গেলেও সাংবাদিক, নিরাপত্তারক্ষী ও স্টাফদের একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিমানে রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার প্রয়োজনে গোপনীয়তা বজায় রাখা হলেও তাঁদের ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে জানানো হয়নি। ফলে তাঁরা অজান্তেই এমন একটি বিমানে ছিলেন, যেটিকে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
৮ জুলাই আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় কী ঘটেছিল
ঘটনার শুরু ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে। ৭ জুলাই কাতার রাজপরিবারের দেওয়া নতুন রাজকীয় বিমানে চড়ে তুরস্কের আঙ্কারায় যান ট্রাম্প। পরদিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় হঠাৎ জানানো হয়, নতুন বিমানের পরিবর্তে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে তিনি ফিরবেন।
সে সময় নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।

বরং ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, নতুন বিমানটি এক দিন আগেই যুক্তরাজ্যের একটি ঘাঁটিতে পাঠানো হয়েছে, যাতে সেখানে থাকা মার্কিন সেনারা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন।
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, নতুন বিমানটিতে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো মিসাইল প্রতিরোধী ব্যবস্থা ছিল না। ইরানের সম্ভাব্য হুমকির প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের বিমান বদল কীভাবে গোপনে করা হয়
আঙ্কারা বিমানবন্দরে সবাইকে দেখিয়ে ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। সেখানে তিনি সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের সঙ্গে কিছুটা হাসি-ঠাট্টাও করেন। এতে সাংবাদিকদের মনে হয়নি যে প্রেসিডেন্টের ভ্রমণ পরিকল্পনায় বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেছে।
কিন্তু এরপরই গোপনে পুরো পরিকল্পনা বদলে যায়।
ট্রাম্প বিকল্প একটি দরজা দিয়ে বিমান থেকে নেমে খাবার সরবরাহের একটি ভ্যানে ওঠেন। পরে রানওয়েতে অপেক্ষমাণ একটি ছোট সামরিক বিমানে করে তিনি আঙ্কারা ছাড়েন। অন্যদিকে সাংবাদিক, স্টাফ ও নিরাপত্তাকর্মীদের বহনকারী পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানই আকাশে উড়ে যায়।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ট্রাম্প ওই বিমানে আছেন। বাস্তবে তিনি এর আগেই অন্য একটি বিমানে চলে গিয়েছিলেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় ট্রাম্পকে একটি ছোট C-32A সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানটি কার্যত বিভ্রান্তিমূলক বা ডিকয় বিমান হিসেবে উড়েছিল।
কেন বিমান বদলের প্রয়োজন হয়েছিল
প্রাথমিকভাবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা প্রকাশ করা হয়নি। তবে পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সম্ভাব্য মিসাইল হামলার আশঙ্কাই ছিল বিমান বদলের মূল কারণ।
নতুন কাতারি বিমানে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো মিসাইল প্রতিরোধী ব্যবস্থা ছিল না বলে জানা যায়। ফলে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পুরোনো বিমান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ওই হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য ও তাৎক্ষণিক হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এ কারণেই ট্রাম্পের গতিবিধি গোপন রাখার জন্য শেষ মুহূর্তে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—যদি প্রেসিডেন্টকে ঝুঁকিপূর্ণ বিমান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে একই বিমানে থাকা সাংবাদিক ও অন্য কর্মীদের কেন জানানো হলো না?
জানালার পর্দা নামানোর অস্বাভাবিক নির্দেশ
৮ জুলাই পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে এমন নির্দেশনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকরা এ বিষয়ে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাইলে তিনি হালকা ভঙ্গিতে উত্তর দেন। তিনি বলেন, তাঁদের যেসব ‘নোংরা লোকজনের’ মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তাদের কারণে সাংবাদিকরা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে ছিলেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি যদি শেষ হয়ে যান, তাহলে সাংবাদিকরাও যাবেন—এমন কথাও তিনি বলেন।
কিন্তু সাংবাদিকদের অভিযোগের মূল বিষয় হলো, এই মন্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাম্প তাঁদের কিছু না জানিয়ে বিমান বদলে ফেলেন। ফলে পরে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁরা বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি তাঁদের ধারণার চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
সাংবাদিকদের মধ্যে কেন ক্ষোভ
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কেউ কেউ মনে করছেন, অজান্তেই তাঁদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও যোগাযোগের ঘাটতির অভিযোগও তুলেছেন।
একজন সফরসঙ্গী সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোয়াইট হাউসের কর্মীদের দায়িত্ব হতে পারে। কিন্তু একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো প্রেসিডেন্টকে সংবাদ হিসেবে কভার করা, প্রেসিডেন্টের হয়ে ঝুঁকি নেওয়া নয়।
ওই সাংবাদিকের বক্তব্যের মূল কথা হলো, সাংবাদিকরা তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ঝুঁকি নিতেই পারেন। কিন্তু সেই ঝুঁকি যেন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাঁদের অজান্তে নির্ধারণ করা না হয়।
এই বক্তব্য থেকেই সাংবাদিকদের ক্ষোভের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাঁদের আপত্তি শুধু বিমান বদলের ঘটনায় নয়; বরং তাঁদের না জানিয়ে সম্ভাব্য বিপদের মধ্যে রেখে যাওয়ার বিষয়টিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কখন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে
৮ জুলাইয়ের ঘটনাটি তখন সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছেও পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না। ট্রাম্পের গোপন বিমান বদলের বিষয়টি পরে প্রকাশ্যে আসে।
সোমবার ওয়াশিংটন পোস্ট ঘটনাটি ফাঁস করার আগে সাংবাদিকদের বড় অংশই জানতেন না যে ট্রাম্প প্রকৃতপক্ষে কোন বিমানে আঙ্কারা ছেড়েছিলেন।
এরপর ঘটনাটির বিভিন্ন দিক সামনে আসতে থাকে। ট্রাম্পও পরে জানান, সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শেই তিনি বিমান বদল করেছিলেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও অল্প কয়েকজন সহযোগীকে গোপনে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের মাধ্যমে ছোট সামরিক বিমানে নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে প্রেস কর্পসসহ হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও কর্মীদের বহনকারী বিমান আলাদাভাবে উড়ে যায়।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটি প্রকাশের পরও সাংবাদিকদের ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়ে ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি—এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে মূল প্রতিবেদনে।
এখানেই ট্রাম্পের বিমান বদল নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য গোপন অভিযান চালানো প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযানে অন্যদের কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রাখা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশেষ করে সাংবাদিকদের কাজ যেহেতু প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড কভার করা, তাঁদের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কতটা অংশ জানানো হবে—এই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন কাতারি বিমানটির নিরাপত্তা সক্ষমতা পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে সীমিত ছিল এবং আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় এ কারণে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
ঘটনাটির মূল প্রশ্ন কোথায়
পুরো ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
প্রথমত, প্রেসিডেন্টকে সম্ভাব্য মিসাইল হামলার ঝুঁকি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, সেই ঝুঁকি সম্পর্কে একই বিমানে থাকা সাংবাদিক ও স্টাফদের পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়নি।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প প্রকাশ্যে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর গোপনে অন্য বিমানে চলে যান।
চতুর্থত, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন।
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা এবং সাংবাদিকদের জানার অধিকার—দুই দিকের ভারসাম্য বিবেচনা করতে হবে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক
এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরে নিরাপত্তা সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে নিরাপত্তার কারণে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত যদি সফরসঙ্গীদের ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞাত রাখে, তাহলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিশেষ করে এখানে সাংবাদিকরা নিজেরাই জানতেন না যে তাঁদের বহনকারী বিমানটি সম্ভাব্য হুমকির মুখে থাকা একটি ডিকয় বিমানে পরিণত হয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের বিমান বদল শুধু প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা কৌশলের ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সাংবাদিকদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ এবং দায়িত্বের সীমা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করেছে।
সামনে যে প্রশ্নগুলো থাকছে
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নিরাপত্তার কারণে প্রেসিডেন্টকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন হলে তাঁর সফরসঙ্গীদের কতটা তথ্য জানানো উচিত?
আরেকটি প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হোয়াইট হাউসের কী ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা উচিত।
তবে মূল প্রতিবেদনে ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউস সাংবাদিকদের ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো অতিরিক্ত তথ্যও এখনো নেই।
ট্রাম্পের বিমান বদল নিয়ে সারসংক্ষেপ
৮ জুলাই আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য ইরানি মিসাইল হুমকির কারণে গোপনে বিমান বদল করেন। তিনি ক্যাটারিং ভ্যানের মাধ্যমে একটি ছোট সামরিক বিমানে চলে গেলেও সফরসঙ্গী সাংবাদিক ও স্টাফরা পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে থেকে যান। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
তাঁদের অভিযোগ, তাঁরা অজান্তেই সম্ভাব্য বিপদের মধ্যে ছিলেন। ট্রাম্প বলেছেন, সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শেই তিনি বিমান বদল করেছিলেন। তবে সাংবাদিকদের ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো সামনে আসেনি।





