পোলাওয়ের চালের দাম দ্বিগুণ, অথচ কৃষকের ঘরে ধান নেই, পোলাওয়ের চালের দাম ছয় মাসে দ্বিগুণ হয়ে কেজিতে ২০০ টাকায় উঠেছে। রপ্তানি ও সরবরাহ সংকটে রাজশাহীতে বাড়ছে দাম, কৃষকেরা পাচ্ছেন না বাড়তি দামের সুফল, বাড়ছে উদ্বেগ।
রাজশাহীতে গত ছয় মাসে পোলাওয়ের চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আগে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হওয়া এই চাল এখন পাইকারি বাজারেই ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে দাম আরও বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানির কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে কৃষকেরা বলছেন, বাড়তি দামের সুফল তাঁরা পাননি, কারণ ধান ঘরে থাকার সময়ই তাঁরা তা বিক্রি করে দিয়েছেন।
প্রধানত ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান থেকে পোলাওয়ের চাল তৈরি হয়। বর্তমানে বাজারে গত আমন মৌসুমে উৎপাদিত ধানের চাল বিক্রি হচ্ছে। দিনাজপুরে এই ধানের উৎপাদন বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার দিনাজপুরে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের ৯৪ হাজার হেক্টরের তুলনায় বেশি।
পোলাওয়ের চালের দাম কেন এত বাড়ল

রাজশাহীর পাইকারি চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে পোলাওয়ের চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাস আগেও একই ধরনের চালের দাম ছিল প্রায় ১০০ টাকা কেজি।
সাহেববাজারের এপি চাউল ভান্ডার-১-এর স্বত্বাধিকারী অশোক প্রসাদ জানান, কোরবানির ঈদের পর থেকেই দাম বাড়তে শুরু করে। তাঁর হিসাবে, কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তাঁর দাবি, চাল বিদেশে রপ্তানি হওয়ার কারণেই বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে। রপ্তানি বন্ধ হলে দাম কমে আসতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
কাদিরগঞ্জ এলাকার পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিনও একই কারণের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার পর বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে দিনাজপুরের চালের আড়তদার আতিয়ার রহমান বিষয়টিকে সরবরাহের ঘাটতির সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তিনি জানান, ধান ওঠার সময় ৭৫ কেজির এক বস্তা চিনিগুঁড়া ধান ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। পরে দাম বেড়ে ৬ হাজার টাকা হয়। বর্তমানে একই পরিমাণ ধানের দাম সাড়ে ৮ হাজার টাকা।
বিদেশে রপ্তানির প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে আতিয়ার রহমান নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, এলাকায় ধানের ঘাটতির কারণেই দাম বেড়েছে; রপ্তানির কারণে হয়েছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
রপ্তানি নিয়ে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের ভিন্ন অভিজ্ঞতা
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, বিদেশে চাল রপ্তানির কারণে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল রপ্তানি করেছে।
চিনিগুঁড়া ধান থেকে তৈরি সুগন্ধি চাল মোড়কজাত করে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইস্পাহানি অ্যাগ্রো ও প্রাণ অ্যাগ্রোসহ কয়েকটি বড় কোম্পানি। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার জহুরা অটো রাইস মিলও স্থানীয়ভাবে সুগন্ধি চাল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, এই ধানকে কেন্দ্র করে জেলায় ছোট-বড় প্রায় ২০০টি অটো রাইস মিল গড়ে উঠেছে।
তবে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকেরা বর্তমান বাজারদরের পুরো সুবিধা পেয়েছেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কৃষকদের বক্তব্য, তাঁরা যখন ধান বিক্রি করেছেন তখন দাম তুলনামূলক কম ছিল। পরে ধানের দাম ও চালের দাম বেড়েছে।
কৃষকের ঘরে ধান নেই, বাজারে দাম বাড়ছে
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার চকযামিনী কাজীপাড়া গ্রামের কৃষক খালেদুল ইসলাম গত মৌসুমে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে চিনিগুঁড়া ধান চাষ করেছিলেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ৭৫ কেজির এক বস্তা ধান ৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
তিনি জানান, ধানের দাম যখন ৫ হাজার ২০০ টাকায় উঠেছিল, তখনই তাঁর ঘরের ধান শেষ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে ধানের দাম আরও বাড়লেও সেই বাড়তি দামের সুবিধা তিনি পাননি।
চিরিরবন্দর উপজেলার আমবাড়ি গ্রামের বড় কৃষক হাবিবুর রহমান গত বছর ৩৬ বিঘা জমিতে চিনিগুঁড়া ধান চাষ করেছিলেন। এবার দাম বাড়তে দেখে তিনি আবাদ বাড়িয়ে ৩৮ বিঘা করেছেন। তিনিও মনে করেন, রপ্তানির কারণে পোলাওয়ের চালের বাজারে দাম বেড়েছে।
এই পরিস্থিতি কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে। একদিকে বাজারে ধানের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকের হাতে সেই ধান নেই। ফলে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা মূলত উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ের ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে কতটা থাকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীতে ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ
পোলাওয়ের চালের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর। রাজশাহী নগরের সাহেববাজার এলাকায় কথা হয় বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত জাহাঙ্গীর আলম খানের সঙ্গে।
তিনি জানান, পাঁচ মাস পর পোলাওয়ের চাল কিনতে গিয়ে তিনি হতবাক হয়েছেন। আগেরবার ১৪০ টাকা কেজি দরে চাল কিনলেও এবার তাঁকে ২৩০ টাকা কেজি দিতে হয়েছে। আগের দাম উল্লেখ করলে দোকানি তাঁকে জানান, আগের সেই দাম আর নেই।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপারমার্কেটসহ বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হওয়া স্বাভাবিক। তবে তাঁর প্রশ্ন, রপ্তানির কারণে এত অল্প সময়ে দেশের বাজারে দাম এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী।
রাজশাহী নগরের কুমারপাড়া এলাকার গোলাপ মামার হোটেলের স্বত্বাধিকারী মো. গোলাপ সরদারও বাড়তি দামের চাপের কথা জানিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, ছয় মাস আগে তিনি প্রতি কেজি পোলাওয়ের চাল ১৩০ টাকা দরে কিনেছেন। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে।
তবে চালের দাম বাড়লেও সে অনুযায়ী তাঁর রেস্তোরাঁর পোলাওয়ের দাম বাড়াতে পারেননি বলে জানান তিনি।
২০০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করে জরিমানা
দাম বৃদ্ধির বিষয়টি খুচরা বাজারেও নজরে এসেছে। কাদিরগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন জানান, তিনি এখন পোলাওয়ের চাল মজুত করছেন না।
তাঁর দোকানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসেছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা দাম নিয়ে আলোচনা ও তর্ক হয়। ২০০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির অভিযোগে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।
জসীম উদ্দিনের দাবি, তিনি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে কোম্পানির গুদাম থেকেই তাঁরা ২০০ টাকা কেজি দরে চাল কিনছেন। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যোগ হয়। এরপর কেনা দামের ওপর ব্যবসায়ীরা ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন পান। তাই ২০০ টাকার নিচে চাল বিক্রি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, বস্তায় কোম্পানির নম্বর দেওয়া থাকে এবং প্রয়োজনে সেই নম্বরে ফোন করে কেনার দাম যাচাই করা সম্ভব। তাঁর মতে, রপ্তানি বন্ধ হলে দ্রুত দাম কমতে পারে।
দিনাজপুরে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ বেড়েছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান দিনাজপুরে উৎপাদিত হয়। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়েও কিছু পরিমাণে এই ধানের চাষ হয়।
দিনাজপুরে এবার মোট ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর এই ধানের আবাদ হয়েছিল ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে।
অর্থাৎ একদিকে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ কিছুটা বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উৎপাদনের পর কৃষকের বিক্রির সময় ও পরবর্তী সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে দামের এই বড় ব্যবধানই বর্তমান বাজার পরিস্থিতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
পোলাওয়ের চালের দাম নিয়ে সামনে যে প্রশ্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে পোলাওয়ের চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণের কথা উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রপ্তানিকে দায়ী করছেন। আবার দিনাজপুরের আড়তদারদের বক্তব্যে স্থানীয় ধানের ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে কৃষকদের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বাজারে পরবর্তী সময়ে ধান ও চালের দাম বাড়লেও উৎপাদনের সময় তাঁরা সেই বাড়তি দাম পাননি। ফলে কৃষক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত একই পণ্যের দামের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ৭৫ কেজির এক বস্তা চিনিগুঁড়া ধানের দাম ৪ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকায় ওঠার তথ্য বাজারের পরিবর্তনের মাত্রা তুলে ধরে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির কতটা রপ্তানি এবং কতটা স্থানীয় সরবরাহ ঘাটতির কারণে হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এক নয়।
রাজশাহীতে পোলাওয়ের চালের দাম ছয় মাসে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে আরও বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা ধান বিক্রি করার পরই বাজারে দাম বেড়েছে। ফলে বর্তমান বাড়তি দামের সুফল তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি। ব্যবসায়ীদের একাংশ রপ্তানিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখালেও দিনাজপুরের আড়তদারদের বক্তব্যে ধানের ঘাটতির কথাও এসেছে।





