নাটকীয়তার ম্যাচে ৯০ মিনিটের পর দুই গোল দিয়ে হার এড়াল পিএসজি, পিএসজির নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে লিলের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করেছে পিএসজি। ৯০ মিনিট পর ভিতিনিয়া ও মার্কিনিয়োসের গোলে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
ফরাসি লিগ ওয়ানে লিলের বিপক্ষে ম্যাচে ৯০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও হার এড়িয়েছে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। ম্যাচের যোগ করা সময়ে ভিতিনিয়া ও অধিনায়ক মার্কিনিয়োসের দুই গোলে শেষ পর্যন্ত ২-২ ব্যবধানে ড্র করেছে বর্তমান ফরাসি ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। লিলের স্তাদ পিয়ের-মোরায়তে হওয়া এই ম্যাচে শেষ মুহূর্তের পিএসজির নাটকীয় প্রত্যাবর্তন স্বাগতিক দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয়।
ম্যাচের শুরুতেই পিএসজির সুযোগ
লিলের মাঠে শুরু থেকেই দুই দলের লড়াই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ম্যাচের প্রথম দিকেই পিএসজি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। আশরাফ হাকিমির একটি প্রচেষ্টা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফলে শুরুতেই লিড নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি প্যারিসের দলটি।
এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে লিলের হাতে চলে যায়। ২৪ মিনিটে স্বাগতিকরা প্রথম গোল পায়। অলিভিয়ের জিরুর চোখধাঁধানো রিভার্স পাস থেকে বল পেয়ে জোরালো শটে লিলেকে এগিয়ে দেন আইসল্যান্ডের মিডফিল্ডার হাকোন হারাল্ডসন।
প্রথমার্ধের বাকি সময়ে পিএসজি গোল শোধ করতে পারেনি। ফলে বিরতিতে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে লুইস এনরিকের দল।
দ্বিতীয়ার্ধেও বদলায়নি চিত্র
দ্বিতীয়ার্ধে পিএসজি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। দলের আক্রমণভাগে পরিবর্তন আনতে খভিচা কাভারেস্খেইয়া ও নবাগত মিকা গটসকে মাঠে নামানো হয়।
তবে পরিবর্তন করেও তাৎক্ষণিক ফল পায়নি পিএসজি। লিলের রক্ষণ সামলে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে স্বাগতিকরা নিজেদের ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত ৮৪ মিনিটে লিলের সেই চেষ্টা সফল হয়। নটিংহ্যাম ফরেস্ট থেকে ধারে আসা দিলাইনে বাকওয়া দুর্দান্ত এক কার্লিং শটে পিএসজির জালে বল পাঠান। এতে লিলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
তখন ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট প্রায় শেষ। পিএসজির জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। ম্যাচে হার যেন সময়ের অপেক্ষা।
পিএসজির নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে বদলে গেল ম্যাচ

কিন্তু ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পরই ম্যাচের চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে দূরপাল্লার দারুণ এক শটে পিএসজিকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন ভিতিনিয়া।
২-১ হওয়ার পর পিএসজির খেলোয়াড়দের মধ্যে আবারও আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। লিলের জয় তখনও হাতের নাগালে থাকলেও ম্যাচ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
এরপর আসে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত। একেবারে শেষ সময়ে ভিতিনিয়ার ক্রস থেকে উঁচুতে লাফিয়ে দারুণ এক হেডে বল জালে পাঠান পিএসজি অধিনায়ক মার্কিনিয়োস।
তার গোলে স্কোরলাইন হয় ২-২। শেষ বাঁশির আগে এই সমতাসূচক গোলই নিশ্চিত করে পিএসজির হার এড়ানো। লিলের গ্যালারি মুহূর্তেই নীরব হয়ে যায়, আর পিএসজি শিবিরে শুরু হয় উল্লাস।
মার্কিনিয়োসের নেতৃত্বে শেষ মুহূর্তের সমতা
ম্যাচ শেষে পিএসজি অধিনায়ক মার্কিনিয়োস দলের মানসিকতার প্রশংসা করেন। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, পিএসজির বিপক্ষে ম্যাচ শেষ বাঁশি বাজার আগে শেষ হয় না।
তিনি আরও বলেন, পিছিয়ে পড়ার পরও ফিরে আসার ক্ষমতাই দলের অন্যতম ইতিবাচক দিক। তার মতে, পুরো মৌসুমের জন্য এমন মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
মার্কিনিয়োসের নিজের গোলটিও ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও দলের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ফলেই পিএসজি ২-০ থেকে ২-২ ব্যবধানে ফিরতে সক্ষম হয়।
টানা দ্বিতীয় ম্যাচে দুই গোলের ঘুরে দাঁড়ানো
লিগ ওয়ানে এখনো জয়ের দেখা না পেলেও পিএসজির জন্য এই ম্যাচটি ছিল টানা দ্বিতীয় এমন ঘটনা, যেখানে দল দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত হার এড়িয়েছে।
এর আগের ম্যাচে রেনের বিপক্ষেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছিল পিএসজি। সেই ম্যাচে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের জোড়া গোলে সমতায় ফিরেছিল দলটি।
অর্থাৎ, পরপর দুই ম্যাচে পিএসজি বড় ঘাটতি থেকে ফিরে এসে ড্র করেছে। লিলের বিপক্ষে অবশ্য প্রত্যাবর্তনটি এসেছে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে।
লুইস এনরিকের জন্য স্বস্তির বার্তা
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ধরে রাখার মিশনের আগে দলের এমন লড়াকু মানসিকতা কোচ লুইস এনরিকেকে স্বস্তি দিচ্ছে। ম্যাচের পর তিনি মৌসুমের শুরুতেই দলের শতভাগ ফর্মে পৌঁছে যাওয়াকে বরং ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মৌসুমের এই পর্যায়ে পুরোপুরি শীর্ষ ফর্মে না থাকলেও দল যে কঠিন পরিস্থিতিতে ফিরে আসতে পারছে, সেটি ইতিবাচক দিক।
লিলের বিপক্ষে ম্যাচে পিএসজির পারফরম্যান্সে তাই দুটি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। একদিকে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত দলটি ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। অন্যদিকে যোগ করা সময়ে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যাচের ফল বদলে দিয়েছে।
লিলের জন্য শেষ মুহূর্তের হতাশা
স্বাগতিক লিলের জন্য ম্যাচটির শেষটা ছিল অত্যন্ত হতাশার। ৮৪ মিনিটে দিলাইনে বাকওয়ার গোলের পর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয় অনেকটাই নিশ্চিত মনে হচ্ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ভিতিনিয়ার গোল এবং পরে মার্কিনিয়োসের হেড সেই হিসাব পাল্টে দেয়। ফলে পুরো ম্যাচে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি লিলে।
নতুন কোচ দাভিদ আনচেলত্তির অধীনে লিলের জন্য এমন ফল নিঃসন্দেহে কঠিন অভিজ্ঞতা। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে মার্কিনিয়োসের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা ইতালিয়ান কোচের জয় উদযাপন দেখতে গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবা ও ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
সামনে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চ্যালেঞ্জ
পিএসজির জন্য লিগ ওয়ানে জয় না পাওয়ার বিষয়টি যেমন নজরে রয়েছে, তেমনি সামনে রয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ধরে রাখার বড় লক্ষ্য।
লিলের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফিরে আসা দলটির মানসিক দৃঢ়তার একটি দিক তুলে ধরেছে। তবে ম্যাচের ফল ছিল ড্র। তাই এই প্রত্যাবর্তন জয়ের সমান তিন পয়েন্ট এনে দেয়নি।
তারপরও লুইস এনরিকের দল যে শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে পারে, সেটি এই ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। আগের ম্যাচে রেনের বিপক্ষে একইভাবে ফিরে আসার পর এবার লিলের বিপক্ষেও একই ঘটনা ঘটেছে।
লিলের বিপক্ষে পিএসজির ম্যাচটি প্রমাণ করেছে, ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে ফল নিশ্চিত ধরে নেওয়া কঠিন। ৯০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও যোগ করা সময়ে দুই গোল করে হার এড়িয়েছে পিএসজি।
ভিতিনিয়ার দূরপাল্লার শট এবং মার্কিনিয়োসের হেড ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফলে লিলে জয়ের খুব কাছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়।
পিএসজির জন্য এটি টানা দ্বিতীয় ম্যাচে দুই গোলের ঘাটতি থেকে ফিরে আসার ঘটনা। সামনে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ধরে রাখার মিশন থাকায় এমন লড়াকু মানসিকতাই আপাতত দলটির জন্য ইতিবাচক দিক হয়ে থাকছে।





