কাতার ইসলামিক ব্যাংকের আগ্রহঃ বিদেশি অংশীদার পাচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, সৌদি ও আমিরাতের সঙ্গেও চলছে যোগাযোগ।
দেশের পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে শক্তিশালী করতে বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার। ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করা, খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানো, তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কাতারের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক কাতার ইসলামিক ব্যাংক (কিউআইবি) সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কাতার সফর করেন। ওই সফরে কিউআইবির সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও অংশীদারি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে।
গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা, পুনর্গঠন কার্যক্রম, মূলধন কাঠামো এবং বিদেশি কৌশলগত অংশীদার নির্বাচনের বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে কাতারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাবও গুরুত্ব পায়।
কেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিদেশি অংশীদার প্রয়োজন

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির পুনর্গঠনে সরকার ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো অংশীদারকে যুক্ত করতে চায় সরকার।
সরকারের বিবেচনায় বিদেশি কৌশলগত অংশীদার যুক্ত হলে শুধু নতুন মূলধন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে না। এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনার অভিজ্ঞতাও পাওয়া যেতে পারে।
সম্ভাব্য বিদেশি অংশীদারকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। অর্থাৎ অংশীদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক বিনিয়োগ নয়, ব্যাংক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন প্রতিষ্ঠান
দেশের পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক।
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, তারল্য সংকট এবং বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে এসব ব্যাংক কার্যত সংকটে পড়েছিল। একীভূত করে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে এসব সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যাংকের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ কারণে মূলধন কাঠামো, খেলাপি ঋণ আদায়, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এই পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার রূপান্তরের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের এই মূলধন সহায়তা ব্যাংকটির আর্থিক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যেই বিদেশি কৌশলগত অংশীদার আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ
ব্যাংকটির আমানতকারীদের সুরক্ষায় ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স ফান্ড থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেওয়ার কর্মসূচির আওতায় জুলাই পর্যন্ত প্রায় আট লাখ ২২ হাজার গ্রাহককে ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের প্রয়োজন বিবেচনায় অর্থ উত্তোলনের সীমা বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার এই কার্যক্রম ব্যাংকটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা
ব্যাংকটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো খেলাপি ঋণ আদায়। এ লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মামলা করা হয়েছে। আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও আদায় পরিস্থিতি ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ আদায়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি কৌশলগত অংশীদার যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক পরিচালনার দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে—সরকারের বিদেশি অংশীদার খোঁজার অন্যতম কারণ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
বড় ধরনের সাংগঠনিক পুনর্গঠন চলছে
পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ, দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো সমন্বয়ের কাজ চলছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো একীভূত করার কাজও এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, সুইফট এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাকে সমন্বিত করার উদ্যোগ রয়েছে।
ব্যবসায়িক প্রয়োজন ও ব্যয়ের বিষয় বিবেচনা করে শাখা ও ব্যবসায়িক ইউনিট পুনর্বিন্যাসের কাজও চলছে। বর্তমানে ৭৮০টি শাখা এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসায়িক ইউনিট পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া চলছে।
প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়
পাঁচটি ব্যাংকের পৃথক প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক কাঠামোকে একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনা একটি বড় পুনর্গঠন কার্যক্রম। কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ও সুইফটসহ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো একীভূত করার মাধ্যমে নতুন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে সমন্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও পদ পুনর্বিন্যাসের কাজও চলছে। ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন শুধু মূলধন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোও যুক্ত রয়েছে।
বিদেশি অংশীদার নির্বাচনে একাধিক দেশের সঙ্গে যোগাযোগ
কাতার ইসলামিক ব্যাংক সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে আগ্রহ প্রকাশ করলেও সরকার শুধু কাতারের সঙ্গেই যোগাযোগ করছে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে।
এর মধ্যে কাতারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব সাম্প্রতিক সচিবালয়ের বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে কোন বিদেশি প্রতিষ্ঠান কৌশলগত অংশীদার হবে, সে বিষয়ে প্রদত্ত তথ্যের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি।
বিদেশি অংশীদার যুক্ত করার মূল লক্ষ্য হিসেবে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানো, তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
পুনর্গঠনের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সরকারের উদ্যোগে একই সঙ্গে আর্থিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন চলছে। একদিকে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারি মূলধন সহায়তা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা করা হয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ ও দায়িত্ব সমন্বয়, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো একীভূত করা এবং ৭৮০টি শাখা ও প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসায়িক ইউনিট পুনর্বিন্যাসের কাজও চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কৌশলগত অংশীদার যুক্ত করার উদ্যোগ ব্যাংকটির পুনর্গঠন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত, খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা এবং ব্যাংকের সাংগঠনিক ও প্রযুক্তিগত পুনর্গঠন রয়েছে।
এখন ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খোঁজা হচ্ছে। কাতার ইসলামিক ব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে। সম্ভাব্য অংশীদারকে পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে কোন প্রতিষ্ঠান চূড়ান্তভাবে অংশীদার হবে, সে বিষয়ে প্রদত্ত তথ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ নেই। ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে বিদেশি অংশীদার নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকছে।





