নিত্যবাজার পরিস্থিতিঃ ডিম-আটার দাম বাড়তি, অন্যদিকে সরবরাহ বাড়ায় অধিকাংশ সবজিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বাজারে।
রাজধানীর বাড্ডা, মহাখালী ও জোয়ারসাহারা বাজার ঘুরে এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে। ডিম, আটা, ময়দা ও চিনির দাম বাড়তি থাকায় ক্রেতাদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সরবরাহ বাড়ায় সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে মাছ ও মাংসের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে চড়া।
গতকাল বৃহস্পতিবার এসব বাজারে দেখা যায়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। অন্যদিকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে অধিকাংশ সবজির দাম কিছুটা কমেছে।
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহের চাপ

বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসসংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আটা, ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের সরবরাহে। সরবরাহে এই চাপের কারণে এসব পণ্যের খুচরা দামও বাড়ছে।
এদিকে গত বুধবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে খোলা সয়াবিন তেল ও পাম তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
তবে নতুন দরের সয়াবিন তেল বাজারে আসার আগেই পুরোনো বোতল নতুন নির্ধারিত দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। ফলে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই এর প্রভাব খুচরা বাজারে দেখা যাচ্ছে।
ডিমের দাম এখনো চড়া
ডিমের বাজারে ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি ডজন ডিম ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিমের দাম এই উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। এর আগে প্রতি ডজন ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হতো।
জোয়ারসাহারা বাজারের মেসার্স ভাই ভাই স্টোরের বিক্রেতা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আড়তদারদের কাছ থেকে ডিমের দাম কমছে না। ফলে খুচরা পর্যায়েও কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
আটার দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা
আটার বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ স্পষ্ট। বর্তমানে দুই কেজির প্যাকেটজাত আটা ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ তিন থেকে চার সপ্তাহ আগেও একই আটা ১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
খোলা আটার দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা আটা ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৪৫ টাকা।
অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আটার দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিক্রেতা মো. নজরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানিগুলো দুই কেজির প্যাকেটজাত আটার দাম বাড়ানোর পর খোলা আটার দামও বেড়েছে।
চিনির বাজারেও একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রায় এক মাস আগে এই চিনি ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।
সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি
অন্যদিকে সবজির বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বাজারে অধিকাংশ সবজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজির মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
এক মাস আগে সরবরাহ কম থাকার কারণে অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে সরবরাহ বাড়ায় সেই চাপ কিছুটা কমেছে।
বাজারে বিভিন্ন সবজির বর্তমান দাম হলো—
- পটোল: ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি
- ঢেঁড়স: ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি
- চিচিঙ্গা: ৬০ টাকা কেজি
- ধুন্দল: ৬০ টাকা কেজি
- শসা: ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি
- করলা: ৮০ টাকা কেজি
- বরবটি: ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি
- ঝিঙা: ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি
- পেঁপে: ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি
- কচুর লতি: ৮০ টাকা কেজি
- মিষ্টি কুমড়া: ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি
- কাঁচা মরিচ: ১২০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি
- বেগুন: ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি
- টমেটো: ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি
- গাজর: ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি
এ ছাড়া প্রতি পিস লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকা, চালকুমড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং কাঁচকলা প্রতি হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পেঁয়াজ ও আলুর দামে বড় পরিবর্তন নেই
পেঁয়াজ ও আলুর বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। মানভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অর্থাৎ সবজির বাজারের কিছু অংশে দাম কমলেও সব ধরনের সবজিতে একই মাত্রার স্বস্তি আসেনি। বিশেষ করে কাঁচা মরিচ, টমেটো ও গাজরের মতো কয়েকটি পণ্যের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি।
মাছ-মাংসের বাজারে স্বস্তি নেই
সবজির বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মাংসের বাজারে পরিস্থিতি এখনো চড়া।
বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সোনালি মুরগির দাম জাতভেদে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি।
ফলে একদিকে সবজির দামে কিছুটা স্বস্তি এলেও অন্যদিকে ডিম, মাংস এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম ক্রেতাদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে বাজারের সামগ্রিক চিত্র
সামগ্রিকভাবে রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে একই সময়ে স্বস্তি ও চাপ—দুই ধরনের পরিস্থিতিই দেখা যাচ্ছে। সবজির সরবরাহ বাড়ায় বেশ কিছু পণ্যের দাম আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু ডিম, আটা ও চিনির মতো প্রয়োজনীয় পণ্যে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে ডিমের দাম এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ১৫০ টাকা ডজনের পর্যায়ে থাকায় ক্রেতাদের জন্য এটি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আটার ক্ষেত্রেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দাম বেড়েছে।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে বোতলজাত সয়াবিনের নতুন দাম নির্ধারণ করা হলেও নতুন দরের তেল বাজারে আসার আগেই পুরোনো বোতল নতুন দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে আটা, ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের দামের সম্পর্কের কথাও জানিয়েছেন।
রাজধানীর বাজারে বর্তমানে নিত্যপণ্যের দামে একক কোনো প্রবণতা নেই। ডিম, আটা, ময়দা ও চিনির দাম বাড়তি থাকলেও সরবরাহ বাড়ায় বেশির ভাগ সবজিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। পেঁয়াজ ও আলুর দামও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে মাছ-মাংসের দাম এখনো চড়া। ফলে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম ক্রেতাদের জন্য এখনো চাপের বিষয় হয়ে আছে।





