বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগে ঘুরছে অটোরিকশার চাকা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে রাজধানীতে বাড়ছে চার্জিং পয়েন্ট। ডিএমপির হিসাবে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ পয়েন্ট ও ৯৯২ গ্যারেজ রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় প্রকাশ্যেই চলছে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবসা। মেইন লাইন থেকে সরাসরি তার টেনে কোথাও গ্যারেজে, আবার কোথাও রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ অটোরিকশায় বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে। প্রতিটি গাড়ির কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট ফি। এসব চার্জিং পয়েন্টের অধিকাংশের অনুমোদন নেই বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কয়েক দিন পর আবার একই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ফলে রাজধানীতে অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ একটি চলমান সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তেজগাঁওয়ে মেইন লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুতের মেইন লাইন থেকে তার টেনে সরাসরি অটোরিকশার ব্যাটারিতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রকাশ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট গ্যারেজের মালিক।
ক্যামেরার উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সরে যান। ফলে ওই সংযোগের অনুমোদন বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের বৈধতা সম্পর্কে তাঁর কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য এ ধরনের পয়েন্টে নিয়মিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রতিটি গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের আবাসিক এলাকাতেও একই চিত্র
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি আবাসিক এলাকার সরু গলির শেষ প্রান্তেও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার একই চিত্র দেখা গেছে। টিনশেডের একটি গ্যারেজে প্রায় ৩০টি অটোরিকশা আবাসিক সংযোগের বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়া হচ্ছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, তাঁরা নিয়ম মেনেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তবে আবাসিক মিটারের মাধ্যমে একই সঙ্গে এতগুলো অটোরিকশা বাণিজ্যিকভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।
এ কারণে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবহার এবং অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবসার মধ্যে বৈধতার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তৃতি কতটা
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, দেশে অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এর মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ অটোরিকশা।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশ বা ডিএমপির তথ্য বলছে, রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে রাজধানীতে অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অবকাঠামোরও বিস্তার ঘটছে। তবে এর একটি বড় অংশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও বড়
সিপিডির হিসাবে, দেশে প্রতিদিন উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে ব্যবহৃত হয়। এর পরিমাণ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট।
এই বিদ্যুতের একটি বড় অংশ অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জের চাহিদা শুধু পরিবহন খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্বের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
সিপিডির প্রগ্রাম সহকারী মো. খালিদ মাহমুদ বলেন, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়ার ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের অপচয় এবং জনদুর্ভোগও বাড়ছে।
অবৈধ সংযোগে রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ
অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ ও সংযোগের অনুমোদন। যেসব পয়েন্ট অনুমোদন ছাড়াই মেইন লাইন বা আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে, সেগুলো থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মো. খালিদ মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ অপচয় এবং জনদুর্ভোগ বাড়ছে।
এদিকে, চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। তবে উৎস প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
পরিবহন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মূল লাইন থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ নেওয়ার কারণে গ্রাহকেরা বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ লাইন থেকেও বিদ্যুৎ নিয়ে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু অবৈধ সংযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
কেন নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ
রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করে। এসব গাড়ির ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সিপিডির হিসাবে, মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ এই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ অবস্থায় অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্টের বিস্তার বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্বচ্ছতা, রাজস্ব এবং জনদুর্ভোগ—তিনটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষ করে যেখানে মেইন লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নেওয়া হচ্ছে অথবা আবাসিক মিটারের মাধ্যমে একাধিক অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে সংযোগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে তথ্য এক নজরে
- দেশে অটোরিকশা প্রায় ৪০ লাখ।
- রাজধানীতে অটোরিকশা রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ।
- রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ডিএমপির তথ্য।
- এসব এলাকায় ৯৯২টি গ্যারেজের তথ্য জানিয়েছে ডিএমপি।
- দেশে দৈনিক উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে ব্যবহৃত হয়।
- এই পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বলে সিপিডির হিসাবে।
সামনে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনুমোদিত ও অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্টের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সিপিডি ও ডিএমপির দেওয়া তথ্য রাজধানীতে সমস্যাটির ব্যাপকতার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে বিদ্যুৎ অপচয়, রাজস্ব ক্ষতি এবং জনদুর্ভোগের বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়মিত নজরদারি ও অনুমোদনহীন সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর কয়েক দিনের মধ্যেই একই কার্যক্রম আবার চালু হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের চিত্র বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় সামনে এনেছে। তেজগাঁও থেকে মোহাম্মদপুর—বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্ট এবং আবাসিক সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ডিএমপির হিসাবে রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে। অন্যদিকে, সিপিডির হিসাবে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়।
অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়ার কারণে রাজস্ব ক্ষতি, বিদ্যুৎ অপচয় ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাই অটোরিকশার চার্জিং ব্যবস্থায় বৈধতা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের নিয়ম কতটা মানা হচ্ছে, সেই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।





