নতুন পে-স্কেলে গ্রেডভেদে ইনক্রিমেট, বাড়ি ভাতা, উচ্চতর গ্রেড ও চিকিৎসা ভাতায় পরিবর্তন আসছে। ২০২৬ কাঠামোয় থাকছে আরও গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।
নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রচলিত অভিন্ন ৫ শতাংশ হার আর থাকছে না। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও উচ্চতর গ্রেডে এ হার ধাপে ধাপে কমবে। গ্রেড-৫-এ ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্টের হার গ্রেডভেদে

বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডেই মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় সেই একই হার আর সব গ্রেডে প্রযোজ্য থাকছে না।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—
- গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬: ৫ শতাংশ
- গ্রেড-৫: ৪ শতাংশ
- গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩: ৩ দশমিক ৫ শতাংশ
- গ্রেড-২: ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ
অর্থাৎ উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতন বেশি হলেও শতাংশের হিসাবে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার কমবে। নতুন ব্যবস্থায় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের হার বহাল থাকলেও উচ্চতর পর্যায়ে তা ধাপে ধাপে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই নীতি
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট কাঠামোর প্রস্তাব রয়েছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেলে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ব্যবস্থাকেও জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মূল বেতন বাড়লেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর লক্ষ্য হিসেবে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় বেতন-ভাতা আরও যৌক্তিক করার কথা বলা হয়েছে।
তবে আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়ন করা হবে না। মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও এর মূল বেতন পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।
বাড়ি ভাতায় কমছে শতাংশ
নতুন পে-স্কেলে বাড়ি ভাতা ব্যবস্থাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে এই হার হবে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ।
আর সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরের এলাকায় বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়ার পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে বাড়ি ভাতার শতাংশ কমলেও মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক বাড়তে পারে। অর্থাৎ ভাতার হার কমানোর পাশাপাশি মূল বেতন বাড়িয়ে মোট আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
৮ বছরেই উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার প্রস্তাব
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন পে-স্কেলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এই সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে ছয় বছর চাকরির শর্ত রাখা হচ্ছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরত কেউ পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে তিনবার উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাবেন।
এ ক্ষেত্রে প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরও ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতায় বড় পরিবর্তন
চিকিৎসা ভাতায়ও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সব কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান।
নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীরা মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীরা ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।
মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রেও প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিল পান।
নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
কয়েকটি ছোট ভাতাও বাড়ছে
জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহণ খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকবে। এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।
ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিদ্যমান হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের বিশেষ প্রণোদনা বাতিল
২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনাও নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হবে। এই প্রণোদনা প্রথমে ৫ শতাংশ ছিল এবং পরে তা ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।
অর্থাৎ নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বিদ্যমান বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও ভাতায় পরিবর্তন
জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করেছে সচিব কমিটি। এর মধ্যে অফিসার ও সদস্যদের প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশিরভাগ ভাতা বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।
তবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি ও বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের অনুরূপ হবে।
কতজন উপকৃত হতে পারেন
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
নতুন কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ইনক্রিমেন্ট, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল ও অন্যান্য ভাতায় গ্রেড ও বয়সভিত্তিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেলের কাঠামোতে একদিকে মূল বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে, অন্যদিকে কিছু ভাতার শতাংশ কমানো বা বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তও রয়েছে। আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও কাঠামোটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।





