সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ, বিরোধী দলের ১৪টির দাবি পূরণ হয়নি। অতীতের সংসদে কে কতটি সভাপতি পদ পেয়েছে, সেই হিসাবও দেখাচ্ছে দীর্ঘ বিরোধের চিত্র।
সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুসারে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পেয়েছে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদ। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মধ্যে অতীতের সংসদগুলোতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব ও সভাপতি পদ পাওয়ার ইতিহাসও সামনে এসেছে।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, বিভিন্ন দেশে সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে পদ দেওয়ার রীতি রয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশেও বিরোধী দল থেকে আনুপাতিক হারে সভাপতি করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কমিটিতে আলোচনার সুযোগ বাড়তে পারে।
এবারের সংসদে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ

বর্তমান সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি।
সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে। তবে বিরোধী দলের দাবি ছিল আরও বড়। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী তারা ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ চেয়েছিল।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে এ দাবির প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকারি দলের বক্তব্য ছিল, এবার অতীতের রীতি অনুসরণ করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন হলে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে সব কমিটিতেই বিরোধী দলের একাধিক সদস্য রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সভাপতি পদ কেন গুরুত্বপূর্ণ
সংসদীয় কমিটিগুলো আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত এবং বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দিতে পারে।
মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলো ১০ সদস্যের। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এসব কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। মন্ত্রী নন—এমন সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই সভাপতি হন।
অন্যদিকে কিছু বিষয়ভিত্তিক কমিটির সভাপতি পদ পদাধিকারবলে নির্ধারিত। তবে অন্যান্য কমিটিতে কোন দল থেকে সভাপতি হবেন কিংবা সদস্যদের মধ্যে দলভিত্তিক অনুপাত কী হবে, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই।
কমিটি সংসদে কণ্ঠভোটে গঠিত হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অতীতে কেন বারবার বিরোধ হয়েছে
বাংলাদেশের বিভিন্ন সংসদে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ এবং কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মতবিরোধ দেখা গেছে। কখনো বিরোধী দল কমিটিতে সদস্য দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বিরত থেকেছে, কখনো সংসদ বর্জন করেছে। আবার রাজনৈতিক সমঝোতার পর কমিটিতে ফিরে এসেছে।
তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিরোধী দলকে আসনসংখ্যার আনুপাতিক হারে সদস্য ও সভাপতি পদ দেওয়ার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এ বিষয়ে অতীতের ঘটনাগুলো দেখলে বিষয়টির ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট হয়।
সপ্তম সংসদে বড় পরিবর্তন
১৯৯১ সালে গঠিত পঞ্চম সংসদে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। এতে প্রশ্ন উঠেছিল, মন্ত্রী নিজেই কমিটির সভাপতি হলে সেই কমিটি নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করতে পারবে।
১৯৯৬ সালে গঠিত সপ্তম সংসদে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধন করে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রীদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়।
তবে একই সংসদে কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়।
কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধন নিয়ে প্রতিবেদন দিতে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেখানে বিএনপির তিনজন সদস্য ছিলেন। বিএনপির মূল দাবি ছিল দুটি—সংসদীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা ১২ করা এবং সংসদে দলগুলোর আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটিতে সদস্য রাখার বিধান করা।
১৯৯৭ সালের ১৪ মে বিশেষ কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে বিএনপির এই দুটি দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ১০ জুন সংসদে প্রতিবেদনটি পাস হলে এর প্রতিবাদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
এরপর কয়েকটি কারণ দেখিয়ে বিএনপি দীর্ঘ সময় সংসদ বর্জন করে। সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিও ছিল এর মধ্যে একটি।
১৯৯৭ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগ সংসদীয় কমিটি গঠন শুরু করলে বিএনপি শুরুতে কমিটির সদস্য হিসেবে কারও নাম দেয়নি। পরে ১৯৯৮ সালের মার্চে দুই দলের দীর্ঘ বৈঠকের পর কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং বিএনপি সংসদে ফেরার ঘোষণা দেয়।
১৯৯৮ সালের ১২ মে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়। এসব কমিটিতে বিএনপিকে মোট ১১১টি সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো কমিটির সভাপতি পদ বিএনপি পায়নি।
অষ্টম সংসদে বদলে গেল দুই দলের অবস্থান
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে যায়। এবার সংসদীয় কমিটি নিয়ে দুই দলের অবস্থান অনেকটা বদলে যায়।
অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ আসনসংখ্যার অনুপাতে ১০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দাবি করে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি আগের সংসদের উদাহরণ তুলে ধরে। তাদের যুক্তি ছিল, সপ্তম সংসদে বিএনপির ১১৬ জন সদস্য থাকলেও আওয়ামী লীগ তাদের কোনো কমিটির সভাপতি পদ দেয়নি।
অষ্টম সংসদে কমিটি গঠনের সময় আওয়ামী লীগের জন্য কিছু সদস্যপদ খালি রাখা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় কমিটি বর্জন করে। পরে ২০০৪ সালে দলটি সংসদীয় কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়।
তবে অষ্টম সংসদেও বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কোনো কমিটির সভাপতি পদ পায়নি।
এই পর্বটি দেখায়, বিরোধী দল যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে তখন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি সামনে আসে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই বিষয়ে অবস্থান অনেক সময় বদলে যায়।
পরবর্তী সংসদে কতটি সভাপতি পদ পেয়েছে বিরোধী দল
পরবর্তী সংসদগুলোতে অবশ্য বিরোধী দলকে একাধিক সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার নজির তৈরি হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ—টিআইবির ২০১৮ সালের ১৭ মে প্রকাশিত ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নবম সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থেকে দুটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। অন্য একটি কমিটির সভাপতির পদও দেওয়া হয়েছিল অন্য বিরোধী দলকে।
দশম সংসদে বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়।
একাদশ সংসদে সরকারি হিসাব কমিটির পাশাপাশি আরও তিনটি কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো হলো প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে বিরোধী দলকে সভাপতি করার কিছু নজির তৈরি হলেও কোনো সংসদেই বিষয়টি স্থায়ী ও আনুপাতিক কাঠামোর মধ্যে যায়নি।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ: রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন
সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বর্তমান বিরোধকে শুধু পদ বণ্টনের বিষয় হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্যটি বাদ পড়ে যায়। কারণ সংসদীয় কমিটিগুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম কাঠামো।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে, সভাপতি কমিটির সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। তবে সরকারি দলের সংসদ সদস্য সভাপতি হলে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অনেক বিষয় আলোচনায় না আসার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাঁর মতে, সরকারি দলের সদস্যদেরও অনেক সময় কমিটিতে খুব বেশি উদ্যোগী হতে দেখা যায় না।
অন্যদিকে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসার সুযোগ বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও মনে করেন, বিএনপি এবার আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দিলে ভবিষ্যতের জন্যও একটি পথ তৈরি হতে পারত। একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বর্তমান দূরত্ব কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।
অতীতের হিসাব কী দেখায়
সপ্তম সংসদে বিএনপি আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটিতে সদস্য রাখার দাবি তুলেছিল। অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ ১০টি সভাপতি পদ দাবি করেছিল। কিন্তু দুই সংসদেই বিরোধী দলের দাবি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সংসদগুলোতে কিছু সভাপতি পদ বিরোধী দল পেলেও সেটি কোনো স্থায়ী নীতিতে রূপ নেয়নি। ফলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ এখনো অনেকাংশে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমান সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের হাতে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদ থাকা এই দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায়। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৪টি সভাপতি পদ চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত একটি পদ পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দূরত্বও স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ক্ষমতায় থাকা দল ও বিরোধী দলের অবস্থান সময়ের সঙ্গে বদলেছে; কিন্তু আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই মূল প্রশ্ন শুধু কতটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দল পাবে, তা নয়। বরং ভবিষ্যতে কমিটির সভাপতি ও সদস্যপদ বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা নাকি নির্দিষ্ট ও স্থায়ী কোনো নীতি—কোনটি কার্যকর হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।





