বিদেশি শিক্ষার্থীদের লাগাম টানছে অস্ট্রেলিয়া, সঙ্গী-সন্তান আনার সুযোগ সীমিত করে ২০২৮ সালের মধ্যে নিট অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামাতে চায় সরকার।
অস্ট্রেলিয়া সরকার অভিবাসন কমাতে অস্ট্রেলিয়া বিদেশি শিক্ষার্থী নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছে। নতুন ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় সঙ্গী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে থাকার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অস্থায়ী অভিবাসীদের ভিসা পরিবর্তন ও অবস্থান বাড়ানোর নিয়মও আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরার কথা রয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের।
সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার নিট বিদেশি অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। বর্তমানে তা প্রায় ৩ লাখের কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি পরিসংখ্যানেও সাম্প্রতিক সময়ে নিট বিদেশি অভিবাসন কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া বিদেশি শিক্ষার্থী নীতিতে কী পরিবর্তন আসছে

বর্তমান ব্যবস্থায় অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বামী, স্ত্রী বা সঙ্গী তাদের সঙ্গে দেশটিতে থাকতে পারেন। নির্দিষ্ট শর্তে তারা কাজের অনুমতিও পান। শিক্ষার্থীর কোর্সের ধরন অনুযায়ী সঙ্গীর কাজের অনুমোদিত সময় ভিন্ন হতে পারে।
এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী নির্ভরশীল সন্তানদেরও শিক্ষার্থীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে এই পারিবারিক সুবিধায় বড় পরিবর্তন আসবে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় তাদের সঙ্গী ও সন্তানকে সঙ্গে রাখার বর্তমান সুযোগ হারাতে পারেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থী ভিসার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার ব্যবস্থা কঠোরভাবে সীমিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এটি শুধু শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে পরিবর্তন নয়। সরকার অস্থায়ী ভিসাধারীদের ভিসা পরিবর্তন, অবস্থান বাড়ানো এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ কমানোর দিকেও নজর দিচ্ছে।
২০২৮ সালের লক্ষ্য ২ লাখ ২৫ হাজার
অস্ট্রেলিয়া সরকারের অভিবাসন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো নিট বিদেশি অভিবাসন কমানো। ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া বক্তব্যে অস্থায়ী অভিবাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হিসেবে থাকছে কে অস্ট্রেলিয়ায় আসবেন, কে সেখানে থাকবেন এবং কারা দেশ ছাড়বেন—এমন একটি কাঠামো।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন নিয়মগুলো মূলত প্রশাসনিক ও ভিসা-সংক্রান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শক্তিশালী নতুন আইন পাসের বিষয়ে বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর সরকার বিধি ও ভিসা শর্ত পরিবর্তনের পথ বেছে নিচ্ছে বলে এবিসি নিউজ জানিয়েছে।
অভিবাসনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কী বলছে
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির নিট বিদেশি অভিবাসন ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার। এর আগের বছরে এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৯ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী আগমনও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ওই সময়ে ৫ লাখ ৬৮ হাজার অভিবাসী দেশটিতে এসেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আগমনকারী গোষ্ঠী ছিল অস্থায়ী শিক্ষার্থীরা—সংখ্যা ১ লাখ ৫৭ হাজার।
এর আগে ২০২৩ সালে নিট বিদেশি অভিবাসন ৫ লাখ ১৮ হাজারে পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালে তা কমে ৪ লাখ ২৯ হাজার হয় এবং ২০২৫ সালে ৩ লাখ ৬ হাজারে নেমে আসে।
অর্থাৎ সরকারের নতুন পরিকল্পনা ঘোষণার সময়েই অভিবাসনের পরিমাণ আগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কমার একটি ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।
কোভিডের পর অভিবাসন বেড়েছিল
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, ব্যাকপ্যাকার এবং অস্থায়ী দক্ষ কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দুই বছর পর কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সীমান্ত বিধিনিষেধ তুলে অস্ট্রেলিয়া আবার সীমান্ত খুলে দেয়। এরপর দেশটিতে বিদেশি আগমন ও অভিবাসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে অভিবাসনের উচ্চ হার নিয়ে আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর চাপের বিষয়টি সামনে আসে। সমালোচকেরা দাবি করে আসছেন, অভিবাসীদের বড় প্রবাহের কারণে আবাসন এবং অবকাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে এবং সামাজিক সংহতিতেও প্রভাব পড়ছে।
তবে সরকারি তথ্য বলছে, গত দুই বছর ধরে নিট বিদেশি অভিবাসন কমার প্রবণতা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩ লাখ ৬ হাজারের হিসাব আগের বছরের ৪ লাখ ২৯ হাজারের তুলনায় কম।
ওয়ান নেশনের আরও কঠোর অভিবাসন প্রস্তাব
অস্ট্রেলিয়া সরকারের নতুন উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে আসছে, যখন কট্টর ডানপন্থী ওয়ান নেশন পার্টি সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তাদের সমর্থন বাড়ার কথা জানিয়েছে।
দলটি চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, তিন বছরের মধ্যে অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার কমিয়ে অস্ট্রেলীয়দের জন্য আরও ‘স্বস্তির জায়গা’ তৈরি করতে চায়।
‘অস্ট্রেলিয়া ফার্স্ট’ নীতির কথা বলা ওয়ান নেশন প্রাথমিক তিন বছর পর নিট বিদেশি অভিবাসন বছরে ১ লাখ ৩০ হাজারে সীমিত রাখার লক্ষ্যও জানিয়েছে। দলটির প্রস্তাবিত কর্মসূচি প্রতিবছর পর্যালোচনা করার কথাও বলা হয়েছে।
ওয়ান নেশনের কিছু নীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির তুলনা করা হয়েছে। তবে এটি সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা নয়; এটি ওয়ান নেশন পার্টির নিজস্ব প্রস্তাব।
শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব
অস্ট্রেলিয়া বিদেশি শিক্ষার্থী নীতির এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে যেসব শিক্ষার্থী পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের ওপর।
বর্তমানে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সঙ্গী এবং নির্ভরশীল সন্তানদের অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় এই সুবিধা সীমিত হলে পরিবারসহ পড়াশোনার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের ভিসা কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
তবে ১৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের বক্তব্যের আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত সব শর্ত জানানো হয়নি। ফলে কোন ধরনের শিক্ষার্থী, কোন কোর্স বা কোন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের ওপর বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে, তা ঘোষণার পর আরও স্পষ্ট হবে।
টনি বার্কের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের বক্তব্যের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিবাসন কাঠামোর বিস্তারিত জানা যাওয়ার কথা। সরকারের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে নিট বিদেশি অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্য পূরণে অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করা এবং পরিবার আনার সুযোগ সীমিত করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে নিট বিদেশি অভিবাসন ছিল ৩ লাখ ১ হাজার, যা আগের সময়ের তুলনায় কম।
অতএব, নতুন নীতির প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নয়, অস্থায়ী কর্মী ও অন্যান্য অস্থায়ী ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট নিয়ম, কার্যকর হওয়ার সময় এবং কোন কোন ভিসা শ্রেণি এর আওতায় আসবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা ও সরকারি নির্দেশনার পরই পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে।





