এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী
News Photocard
নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
News Photocard (1)
নিউইয়র্ক সফর: প্রথম দিনে ১০ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ প্রধানমন্ত্রীর
News Photocard (18)
প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর
News Photocard (15)
কিলোমিটারপ্রতি যত বাড়ল বাসভাড়া

বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ছাড়াতে পারে ৬০ হাজার কোটি টাকা

বিদ্যুৎ খাতে লোকসান চলতি অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের বাড়তি দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়ছে বড় চাপ।

গ্যাসের সংকট, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির কারণে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের হিসাব ধরেছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাবের তুলনায় লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সংকট থাকায় ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ওপরও বাড়ছে আর্থিক চাপ।

বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পেছনে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বিপিডিবি ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের হিসাব করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সেই হিসাবকে আরও বড় করে তুলতে পারে।

গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে কয়লার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন জ্বালানির খরচ একসঙ্গে বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লোকসান ও ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে।

এলএনজির দাম বাড়ায় নতুন চাপ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে এলএনজির উচ্চমূল্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হলেও সেপ্টেম্বরে দাম বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে আমদানি করা এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজির জন্য ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য এই খাতে বরাদ্দ ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ অর্থবছরের পুরো সময়ের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি অর্থ প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি ভর্তুকিতে ব্যয় হয়েছে।

পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা

এলএনজি ভর্তুকির পাশাপাশি পেট্রোবাংলার ওপরও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরও ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রভাবে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে গত আড়াই মাসে এলএনজির জন্য প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে।

এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোর আশঙ্কা

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও কয়েক গুণ বাড়তে পারে। ফলে এলএনজির মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচকেই প্রভাবিত করছে না, একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গ্যাসের সংকটের কারণে বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার প্রভাবও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি পড়ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও কমেনি বিপিসির লোকসান

বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি জ্বালানি তেলেও লোকসান অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান পুরোপুরি কমেনি।

গত সাড়ে ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির মাসিক গড় লোকসান ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, প্রিমিয়ামসহ আমদানি ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ পেতেও আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।

এতে আমদানির প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়ছে এবং মূল্য সমন্বয়ের পরও বিপিসির লোকসান পুরোপুরি কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

বছরে ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনই ডিজেল।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম প্রায় ২০৫ টাকা লিটার।

এই আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলে। ফলে তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়লে দেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ে।

বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ও ভর্তুকির চাপ কোথায় যাচ্ছে

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একই সঙ্গে কয়েকটি ব্যয় বাড়ছে। একদিকে গ্যাসের সংকটের কারণে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ছে। অন্যদিকে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলএনজির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি। স্পট মার্কেটে এলএনজি কিনতে বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ায় আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর লোকসান ও আর্থিক চাপ একসঙ্গে বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব: আমদানিনির্ভরতা কমানো

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি—দুটিই বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার বাড়ার কারণে এই খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য পরিবহন ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, এতে ডিজেলের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান বাড়ার আশঙ্কার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলএনজি, জ্বালানি তেল ও কয়লার ব্যয়। বিপিডিবির ৪৫ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক লোকসান হিসাব এখন ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

একই সময়ে এলএনজি ভর্তুকি, পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় এবং বিপিসির বড় লোকসান সরকারের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই আর্থিক চাপ কতটা বাড়বে, সেটিই এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত