চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট: গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতিতে উৎপাদন ৩৫% কমেছে, ব্যয় ২৫% বেড়েছে। চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট গভীর হচ্ছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র ঘাটতি, লোডশেডিং, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহন ভাড়ার ঊর্ধ্বগতির কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করেছে। এর ফলে দেড় সহস্রাধিক কারখানায় উৎপাদন ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে দ্রুতগতিতে।
চট্টগ্রামের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উৎপাদন কমছে কিন্তু ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছে—যা শিল্প মালিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট: উৎপাদন কমে ব্যয় বেড়েছে

চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব জানান, জ্বালানি সংকট, লোডশেডিং এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি শিল্পখাতে “মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন,
গত কয়েকদিনেই সার্বিকভাবে উৎপাদন ব্যয় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই মন্তব্য চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে, যেখানে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে খরচ বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে।
জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের প্রভাব
চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানাগুলোকে বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে রি-রোলিং, ইস্পাত ও সিমেন্ট খাতে এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
ইস্পাত শিল্পে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটের প্রভাব
দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ইস্পাতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দাম সমন্বয় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটের কারণে দেশের মোট ইস্পাত শিল্পের ৬২ শতাংশই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
রি-রোলিং মিল ও নির্মাণ খাতে প্রভাব
চট্টগ্রামে অবস্থিত প্রায় ৫০টি রি-রোলিং মিল বর্তমানে উৎপাদন সংকটে রয়েছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে এসব কারখানায় উৎপাদন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম প্রতি টনে ৭০ থেকে ৯০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে প্রতি টন রড উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে ইস্পাত খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সিমেন্ট শিল্পেও একই চিত্র
চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকট সিমেন্ট শিল্পেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। চট্টগ্রামে অবস্থিত ৯টি সিমেন্ট কারখানায় উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিও এই খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছে।
মোট শিল্প পরিস্থিতি: চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটের সার্বিক চিত্র
জানা যায়, চট্টগ্রামে নিবন্ধিত ও সচল ১ হাজার ৬৭৬টি শিল্পকারখানার মধ্যে পোশাক, জাহাজ ভাঙা, রি-রোলিং ও সিমেন্ট খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে এসব খাতে:
- উৎপাদন কমেছে ২৫–৩৫%
- উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ২০–২৫%
- জ্বালানিনির্ভর খরচ বেড়েছে দ্রুত
এই পরিস্থিতি চট্টগ্রামের শিল্প খাত সংকটকে একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও তুলনা
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বিভিন্ন দেশের শিল্পখাতে পড়লেও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।




