এক বছরে দ্বিগুণ ছোট ঋণের খেলাপি, , এক বছরে ৪৫ লাখ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি ও আয় সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ছোট ঋণের খেলাপি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক কোটি টাকার কম ঋণ নেওয়া সিএমএসএমই, কৃষি, আবাসন ও ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি দেশের খুচরা ঋণের গুণগত মানের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।
ছোট ঋণের খেলাপি এক বছরে দ্বিগুণের বেশি

বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ মাস শেষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক কোটি টাকার কম ঋণ রয়েছে এমন খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জনে পৌঁছেছে।
গত বছরের মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৪ লাখ নতুন গ্রাহক খেলাপির তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই প্রবণতা শুধু ঋণ আদায়ের বিষয় নয়, বরং ক্ষুদ্র ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও চাপের প্রতিফলন।
কেন বাড়ছে ছোট ঋণের খেলাপি
প্রতিবেদনে কয়েকটি কারণকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- উচ্চ মূল্যস্ফীতি
- জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
- পারিবারিক ঋণের চাপ
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় মন্দা
- কৃষি খাতে আয় কমে যাওয়া
এসব কারণে ছোট ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে স্বল্প অঙ্কের ঋণেও খেলাপির হার দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বড় ঋণখেলাপি সরাসরি বেশি আর্থিক ক্ষতি সৃষ্টি করলেও ছোট ঋণের খেলাপি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের চিত্র
মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে সিএমএসএমই খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশেরও বেশি খেলাপি হয়েছে।
এই খাতের মধ্যেও কুটির শিল্পে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫৩ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ।
এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক ঝুঁকির চিত্রও তুলে ধরে।
বড় ঋণেও খেলাপি বাড়ছে
শুধু ছোট ঋণ নয়, বড় ঋণেও খেলাপির হার বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা।
এই শ্রেণির ঋণের সাড়ে ৪২ শতাংশ খেলাপি হয়েছে।
এক বছরে এই শ্রেণির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৮ জন থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৫ জনে পৌঁছেছে।
বিভিন্ন ঋণ স্তরে খেলাপির হার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
- ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার সাড়ে ২৬ শতাংশের বেশি
- ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে প্রায় ৪৫ শতাংশ
- ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে প্রায় ৩৬ শতাংশ
- ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণে প্রায় ৩৯ শতাংশ
- ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে প্রায় ৪৫ শতাংশ
এতে বোঝা যায়, ঋণের প্রায় সব স্তরেই খেলাপি বাড়ার প্রবণতা রয়েছে।
খাতভিত্তিক খেলাপির চিত্র
ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ এই খাতে বিতরণ হলেও এর ৪৪ শতাংশ এখন খেলাপি।
এ ছাড়া—
- শিল্প খাতে খেলাপির হার প্রায় ৩২ শতাংশ
- নির্মাণ খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ
- কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ
- ভোক্তা ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৭ শতাংশ
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে।
তার মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতামত
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বলেন, বড় ঋণের পাশাপাশি এখন কৃষি ও এসএমই খাতের ঋণও খারাপ হতে শুরু করেছে। এ কারণে শাখা পর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় এসব ঋণ নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল মেহেদী বলেন, ছোট উদ্যোক্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়েন। তার মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ের প্রভাবও পুরোপুরি কাটেনি, ফলে ছোট ঋণের খেলাপি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে ছোট ও বড়—উভয় ধরনের ঋণেই খেলাপি বাড়ছে। তবে এক কোটি টাকার কম ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণের বেশি হওয়াকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুচরা ঋণের গুণগত মানের অবনতির গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছে। মূল্যস্ফীতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ এই প্রবণতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।





