পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন আজ শনিবার প্রকাশ হতে পারে। ৩ ধাপে বাস্তবায়ন, জুলাই থেকে কার্যকর, বেতন-ভাতা ও পেনশনে পরিবর্তনের বিস্তারিত জানা গেছে সরকারি সূত্রে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন আজ শনিবার প্রকাশ হতে পারে। সরকারের একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) ইতিমধ্যে তা ছাপার কাজ করছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে দুপুরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। সে সময় মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। তবে অনুমোদনের পর প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন এটি প্রকাশের পর্যায়ে এসেছে।
নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি

নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের অপেক্ষা তৈরি হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয়েছে।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। প্রজ্ঞাপন ছাপার কাজ বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে চলছে। পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও শেষ করা হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আজ শনিবার দুপুরের পর প্রজ্ঞাপনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হতে পারে। তবে প্রকাশের বিষয়টি প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে ৩ ধাপে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। মোট তিন ধাপে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ জুলাই মাসকে কার্যকারিতার তারিখ ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাওয়ার আওতায় থাকবেন।
তবে সরকারি ব্যয়ভার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয় বিবেচনায় মূল বেতন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
প্রায় ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি উপকৃত
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগীও এই কাঠামোর সুবিধার আওতায় থাকবেন।
সরকারি হিসাবে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়ছে
নতুন বেতন কাঠামোয় বর্তমানে থাকা ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হচ্ছে। তবে গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে।
২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
এর ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত দাঁড়াবে ১:১.৭৮।
এক দশকের বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আসছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এসব গ্রেডে আগের তুলনায় মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে।
বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আদেশ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য মূল গেজেটের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক ৫ থেকে ৭টি এসআরও জারির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সশস্ত্র বাহিনী, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বাস্তবায়ন আদেশ থাকবে।
ফলে মূল প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হবে।
আইবাস++ সফটওয়্যারে পরিবর্তনের কাজ চলছে
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে সরকারি বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার ‘আইবাস++’-এও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
২০১৫ সালের পে স্কেল বাস্তবায়নের সময় আইবাস++ সফটওয়্যার ছিল না। এবার নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার কারণে সফটওয়্যারে বেতন পুনর্নির্ধারণ বা ফিক্সেশন এবং নতুন হিসাব কাঠামো যুক্ত করা হচ্ছে।
এ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া সোয়া ৯ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য সমন্বয় করা। একই সঙ্গে পেনশনের স্তর সমন্বয়ের কাজও চলছে।
পেনশনভোগীদের জন্যও বাড়বে সুবিধা
নতুন বেতন কাঠামোয় পেনশনভোগীদের জন্য ধাপে ধাপে সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশনধারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের জন্য বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি পেনশনধারীদের ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। তবে এসব সুবিধা মূল বেতন বাস্তবায়নের সঙ্গে একই সময়ে কার্যকর হবে না; অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর শুরু হবে বেতন ফিক্সেশন
নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর সরকারি কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন ফিক্সেশন এবং বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নতুন বেতন কাঠামো যেহেতু চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হয়েছে, তাই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেতন পুনর্নির্ধারণ ও সংশ্লিষ্ট হিসাব সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে উঠবে।
আইবাস++-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের তথ্য সমন্বয়ের কাজও এর সঙ্গে যুক্ত থাকছে।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি সুবিধা পাবেন।
তবে ব্যয়ভার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয় বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরও নতুন কাঠামোর সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হবে না।
আজকের সম্ভাব্য প্রজ্ঞাপন কেন গুরুত্বপূর্ণ
৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন এক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ পরও সেটি প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে।
এখন বিজি প্রেসে প্রজ্ঞাপন ছাপার কাজ চলা এবং প্রয়োজনীয় ভেটিং ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার তথ্য প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আজ শনিবার দুপুরের পর নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ আরও স্পষ্ট হবে। এরপর বেতন ফিক্সেশন, বকেয়া পাওনা সমন্বয় এবং বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের পৃথক বাস্তবায়ন আদেশের কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।
সরকারি আর্থিক নীতি ও বেতন-ভাতা সংক্রান্ত সরকারি তথ্যের জন্য অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটের প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র বিভাগও অনুসরণ করা যেতে পারে।





