মাদক নিয়ন্ত্রণের কর্মকর্তারাই জড়িত হওয়া নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাতক্ষীরা, রামু ও চট্টগ্রামের ৩ ঘটনায় তদন্ত ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে।
দেশে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে দায়িত্ব পালনকারী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরই মাদকসহ গ্রেপ্তারের সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় মাদকবিরোধী অভিযান, নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাতক্ষীরা, কক্সবাজারের রামু ও চট্টগ্রামে পৃথক ঘটনায় পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যদের মাদকসহ গ্রেপ্তারের তথ্য সামনে এসেছে। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব ঘটনায় শুধু অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা নয়, মাদকের উৎস, সরবরাহ ও সংশ্লিষ্টতার পুরো চক্র খতিয়ে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, কোনো পুলিশ সদস্য মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদক সেবন কিংবা কারবারে জড়িত থাকার সন্দেহে কিছু সদস্যকে নজরদারির আওতায়ও রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের জড়িত হওয়া নিয়ে যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে

সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি পৃথক ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মাদকসহ গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনাগুলোর স্থান, সময় ও পরিস্থিতি আলাদা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাদক বহন বা মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
সাতক্ষীরায় মাদক কারবারিদের ধরতে অভিযান চালানোর সময় দুই পুলিশ সদস্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হন। কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন এপিবিএনের এক সদস্য। এর আগে চট্টগ্রামে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয় খুলনা জেলা পুলিশের এক কনস্টেবলকে।
ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনার একটি বড় জায়গা হলো—যাঁরা মাদকবিরোধী আইন প্রয়োগে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের কেউ কেউ কীভাবে মাদক বহন বা কারবারের অভিযোগে জড়িয়ে পড়ছেন। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
সাতক্ষীরায় দুই পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার
গত ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বকচরা বাইপাসসংলগ্ন এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে মো. মোস্তাইন বিল্লাহ (৩০) ও নাজমুল (২৮) গ্রেপ্তার হন।
মোস্তাইন বিল্লাহ জেলা পুলিশের স্টাফ ফোর্স (এসএফ) শাখায় কর্মরত ছিলেন। নাজমুল জেলা পুলিশের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সংশ্লিষ্ট থানার ওসি মাহমুদুর রহমান জানান, এ ঘটনায় ডিবির একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং তিনিই মামলাটি তদন্ত করছেন। উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে দুই পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে এই কারণে যে, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রেক্ষাপটেই দুই পুলিশ সদস্যকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএন সদস্য গ্রেপ্তার
একই দিন কক্সবাজারের রামুতে মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদার (২৭) নামের এপিবিএনের এক সদস্যকে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে বিজিবি।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তাঁর কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন এবং নগদ ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে রামু থানায় মামলা করা হয়।
এই ঘটনাতেও মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বহনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে মামলার তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের বিস্তারিত বিষয় নির্ধারিত হওয়ার কথা।
চট্টগ্রামে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার
এর আগে গত ৫ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আশিকুল ইসলাম (৩০) নামের এক পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আশিকুল ইসলাম খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে বলা হয়, কক্সবাজার থেকে ইয়াবার একটি বড় চালান সংগ্রহ করে তিনি খুলনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন।
সাতক্ষীরা ও রামুর ঘটনার পাশাপাশি চট্টগ্রামের এই ঘটনাও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মাদকসংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
তদন্তে শুধু অভিযুক্ত সদস্য নয়, পুরো চক্র দেখার তাগিদ
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের জড়িত হওয়া সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের পরিধি শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে পুরো চিত্র পাওয়া নাও যেতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হলে তিনি মাদক কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন, কার কাছ থেকে পেয়েছেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে আর কারা যুক্ত—এসব বিষয়ও তদন্তে আসা প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সুযোগ ব্যবহার করে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো সুবিধা নিয়েছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ কোনো বাহিনীর সদস্য গ্রেপ্তার হলে সরবরাহকারী, পরিবহনব্যবস্থা, অর্থ লেনদেন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্তের গুরুত্ব বাড়ে।
অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেনের মতে, শুধু মামলা ও বরখাস্তের মতো ব্যবস্থা নিলেই এই ধরনের প্রবণতা বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই মাদক সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য বের করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের নজরদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থার কথা জানাল সদর দপ্তর
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের মাদক সেবন কিংবা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মাদক সেবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে মাদক চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ রয়েছে—এমন কিছু পুলিশ সদস্যকেও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
সদর দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য ডোপ টেস্টে মাদকসেবী হিসেবে শনাক্ত হলে চাকরিচ্যুতিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদকসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, তদন্তে কোনো পুলিশ সদস্যের মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে জবাবদিহির গুরুত্ব
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের জড়িত হওয়া নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি মাদক বহন, সংরক্ষণ বা কারবারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সাতক্ষীরা, রামু ও চট্টগ্রামের ঘটনাগুলো একে অপরের থেকে আলাদা। ফলে তিনটি ঘটনাকে একই ধরনের অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে তিন ক্ষেত্রেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে—এটাই এসব ঘটনাকে একই বৃহত্তর আলোচনার মধ্যে এনেছে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে মাদকের উৎস, সরবরাহ, পরিবহন, অর্থ লেনদেন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য বের করা গেলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই এবং প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।





