আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
প্রবাসী কার্ডে মিলবে ১০ বিশেষ সুবিধা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (9)
ডগ স্কোয়াড থেকে ডার্ক ওয়েব ডিএনসির হাতে নতুন ক্ষমতা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (30)
সেই দিনই বুঝেছিলাম শেখ হাসিনার পতন সুনিশ্চিত: সাদিক কায়েম
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (9)
সন্ধ্যার মধ্যে যেসব জেলায় ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক অগ্রযাত্রা

ঢাকা ডুবছে চার কারণে

ঢাকা ডুবছে চার কারণে, ঢাকার জলাবদ্ধতা কেন কমছে না? দুর্বল ড্রেনেজ, সমন্বয়হীনতা, পলিথিন ও খাল দখলের ৪ বড় কারণ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে রাজধানীর সংকটের বাস্তব চিত্র।

রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রতি বর্ষাতেই একই চিত্র দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে বন্ধ হয়ে পড়ে প্রধান সড়ক। এতে গণপরিবহন ব্যাহত হয়, অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে চারটি বড় কারণ রয়েছে—দুর্বল ড্রেনেজ ও সীমিত পাম্পিং-সক্ষমতা, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যে নর্দমা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং খাল-জলাধার দখল-ভরাটের সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ।

গত দেড় দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন নির্মাণ, বক্স কালভার্ট, পাম্প স্টেশন স্থাপন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এরপরও প্রতি বর্ষায় রাজধানীর বড় অংশ পানির নিচে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এত প্রকল্পের পরও কেন ঢাকার জলাবদ্ধতা কমছে না?

ঢাকার জলাবদ্ধতা কেন কমছে না?

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কোনো একক কারণে তৈরি হচ্ছে না। বরং পুরোনো ও সীমিত সক্ষমতার ড্রেনেজ অবকাঠামো, নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যাওয়ার কারণে সংকটটি আরও জটিল হয়েছে।

একদিকে নগরীর জনসংখ্যা, ভবন ও কংক্রিটের বিস্তার বেড়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সেই অনুপাতে তৈরি হয়নি। ফলে স্বল্প সময়ে ভারি বৃষ্টি হলেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে।

১. দুর্বল ড্রেনেজ ও সীমিত পাম্পিং-সক্ষমতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বিদ্যমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক বর্তমান নগর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজধানীর অনেক ড্রেন, কালভার্ট ও ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন কয়েক দশক আগের জনসংখ্যা ও বৃষ্টিপাতের হিসাব ধরে নির্মিত হয়েছিল।

তবে সময়ের সঙ্গে ঢাকার জনসংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বহুতল ভবন, কংক্রিটের রাস্তা ও স্থাপনা বেড়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমেছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।

ফলে অনেক এলাকার ড্রেনের ধারণক্ষমতা এখন আর পর্যাপ্ত নয়। কোথাও আবার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ড্রেনে পলি জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পাম্প স্টেশন ও পর্যাপ্ত পাম্পিং-সক্ষমতাও এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই ভারি বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে। এ পরিস্থিতি ঢাকার জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে।

২. সেবা সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা

রাজধানীর ড্রেনেজ, খাল, সড়ক, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের হাতে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, বিআইডব্লিউটিএ এবং সড়ক বিভাগের মতো বিভিন্ন সংস্থা একই এলাকায় আলাদা আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।

অনেক ক্ষেত্রে একটি সংস্থা নতুন সড়ক নির্মাণের পর অন্য সংস্থা পাইপলাইন বসানোর জন্য সেই সড়ক কেটে ফেলে। আবার কোথাও ড্রেন নির্মাণের পর অন্য কোনো প্রকল্পের কাজের সময় তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে একদিকে জনদুর্ভোগ বাড়ে, অন্যদিকে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায় না।

অর্থাৎ, একটি প্রকল্পের সঙ্গে আরেকটি প্রকল্পের যথাযথ সমন্বয় না থাকায় নগর অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

৩. পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যে বন্ধ হচ্ছে ড্রেন

রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, খাবারের মোড়ক ও গৃহস্থালি বর্জ্য ড্রেন, খাল ও ক্যাচপিটে গিয়ে জমা হচ্ছে।

ভারী বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য ড্রেনের মুখ বন্ধ করে দেয়। ফলে পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে পারে না। কোথাও আবার ড্রেনের ভেতরে জমে থাকা বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন বলেন, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যের কারণে ড্রেন ও আউটফল বন্ধ হয়ে গেলে পানি দ্রুত নামতে পারে না। তাঁর মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাধার দখল ও ভরাট এবং অতিবৃষ্টির কারণে বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

৪. খাল-জলাধার হারিয়ে যাওয়ায় বাড়ছে চাপ

একসময় ঢাকার অসংখ্য খাল ও জলাধার প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি ধারণ করত এবং তা নদীতে নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এসব খালের বড় অংশ সংকুচিত হয়েছে কিংবা বিলুপ্ত হয়েছে।

অনেক জলাধার আবাসন, সড়ক বা বাণিজ্যিক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে কংক্রিটের বিস্তার বাড়ায় খোলা মাটি ও সবুজ এলাকা কমে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগও কমেছে।

এর ফলে বৃষ্টির পানির বড় অংশ সরাসরি ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। অথচ বর্তমান ড্রেনেজ অবকাঠামোর সক্ষমতা সেই চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় অবশিষ্ট খাল ও জলাধার সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়লে প্রাকৃতিক জলাধার না থাকায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে।

জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়

ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধু মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি করে না; এর সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। কয়েক ঘণ্টার জলাবদ্ধতায় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না।

ব্যবসাবাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ে। দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হতে পারে। যানজটের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে।

দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমাধান নয়

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান মনে করেন, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করে রাজধানীর জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তাঁর মতে, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। অবশিষ্ট খালগুলো জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ ও খনন শেষ করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

একই সঙ্গে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা কী?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এটি শুধু সিটি করপোরেশনের একক দায়িত্ব নয়।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, সড়ক অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি জানান, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও ড্রেন পরিষ্কার, পাম্পিং-সক্ষমতা বাড়ানো এবং একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে।

প্রকল্পের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা

গত দেড় দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে বহু প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি।

খাল ও জলাধার রক্ষা না করলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। একইভাবে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নতুন ড্রেন নির্মাণ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

সুতরাং ঢাকার জলাবদ্ধতা কমাতে আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো, পর্যাপ্ত পাম্পিং-সক্ষমতা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাল-জলাধার সংরক্ষণ এবং সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো—প্রকল্পের পর প্রকল্প নয়, বরং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা, খাল-জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো গড়ে তোলাই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ। তা না হলে প্রতি বর্ষাতেই একই প্রশ্ন ফিরে আসবে—কেন ডুবছে ঢাকা?

সর্বাধিক পঠিত