এইমাত্র

আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক অগ্রযাত্রা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
বৃষ্টি নিয়ে নতুন বার্তাঃ দেশজুড়ে বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (36)
কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যুতে বিরোধীদলীয় নেতার শোক
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (31)
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর সরকার
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (15)
যে কারণে ৬ দিন ধরে ডুবে আছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ

গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন: যা যা বদলে যাবে নতুন যুক্ত হবে যেসব বিষয়

গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন কীভাবে হবে? রাষ্ট্র, সরকার ও বিচার ব্যবস্থায় ৮৪ সংস্কারে কী বদল আসছে—জানুন বিস্তারিত।

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটে ভোটারদের সামনে থাকবে একটি মৌলিক প্রশ্ন—জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তারা সম্মত কি না। এর উত্তর দিতে ভোটাররা আলাদা ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন কীভাবে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় কী ধরনের কাঠামোগত রদবদল আসবে। কারণ, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ভবিষ্যৎ সংসদ বাধ্য থাকবে।

গত কয়েকদিন ধরে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ প্রচারণা থেকে সরে এসে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথ খুলবে।

গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন: মূল কাঠামো

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গণভোটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব
এর মধ্যে—

  • ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার

  • ৩৭টি আইন, অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার

গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন কার্যকর করতে আগামী সংসদকে ৯ মাস বা ২৭০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্পন্ন করতে হবে।
অন্যদিকে, ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদ পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাবে।

ভাষা, পরিচয় ও রাষ্ট্রের মূলনীতি কীভাবে বদলাবে?

বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শুধু বাংলার স্বীকৃতি রয়েছে।
কিন্তু গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন অনুযায়ী—

  • বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকবে

  • দেশের সব মাতৃভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবে

  • নাগরিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’, ‘বাঙালি’ নয়

এছাড়া সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে যুক্ত হবে—
সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি

বর্তমানে থাকা চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) এখানে আর প্রাধান্য পাবে না।

মৌলিক অধিকার: নতুন কী যুক্ত হচ্ছে?

বর্তমান সংবিধানে মৌলিক অধিকার রয়েছে ২২টি।
জুলাই সনদ অনুযায়ী নতুন করে যুক্ত হবে—

  • নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের অধিকার

  • ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার

এছাড়া জরুরি অবস্থায়ও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না—এমন নিশ্চয়তা যুক্ত হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় বড় পরিবর্তন

জরুরি অবস্থা

এখন প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরেই জরুরি অবস্থা জারি হয়।
কিন্তু গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন হলে—

  • মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে

  • বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হবে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন—

  • উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটে

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ

এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ—

  • ১০ বছর বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না

এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে সীমা আরোপ করবে।

সংসদ ব্যবস্থা ও নির্বাচন কাঠামো

বাংলাদেশে এতদিন সংসদ ছিল এককক্ষবিশিষ্ট।
কিন্তু গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন অনুযায়ী—

  • সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট

  • উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০ সদস্য

  • ভোটের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টন হবে

এছাড়া—

  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল

  • নারীদের সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ১০০

  • ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত

এসব পরিবর্তন সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে বলে মনে করছে সরকার।

আইন ও বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার

জুলাই সনদে বিচার বিভাগের জন্য সবচেয়ে বড় সংস্কারগুলো রাখা হয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে আপিল বিভাগ থেকে

  • বিচারক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না

  • বিচার বিভাগে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা

  • প্রত্যেক বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন

এছাড়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে।

ন্যায়পাল ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ

দীর্ঘদিন সংবিধানে থাকলেও ন্যায়পাল কখনো নিয়োগ হয়নি।
গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন অনুযায়ী—

  • বিরোধী দলসহ সাত সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল নিয়োগ

  • দুদক, পিএসসি, মহা হিসাব নিরীক্ষক নিয়োগেও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ

যদিও এসব বিষয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।

৩৭টি আইন ও প্রশাসনিক সংস্কার

সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আরও ৩৭টি সংস্কার বাস্তবায়ন হবে—

  • বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশন

  • স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস

  • জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন

  • নতুন বিভাগ: কুমিল্লা ও ফরিদপুর

এসব সংস্কার আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হবে।

ভোটারদের জন্য চ্যালেঞ্জ কোথায়?

গণভোটের ব্যালটে এই বিশাল পরিবর্তনের বিস্তারিত কিছুই লেখা থাকবে না।
মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্টের ভিত্তিতে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই কারণেই গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন বিষয়টি বোঝা এখন ভোটারদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই গণভোট হতে যাচ্ছে এক অনন্য ঘটনা।
গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধান পরিবর্তন শুধু আইন বদলাবে না—এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে।

ভোটের দিন তাই শুধু দল নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন ভোটাররা।

সর্বাধিক পঠিত