যে কারণে ৬ দিন ধরে ডুবে আছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। দুর্বল পানি নিষ্কাশন, নিচু রেললাইন ও পুরোনো সমস্যায় বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচল।
চট্টগ্রাম নগরের শমসেরপাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ডুবে আছে ছয় দিন ধরে। ভারী বৃষ্টির পর রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, দীর্ঘদিনের দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, নিচু রেলপথ এবং পুরোনো পরিকল্পনার সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী একটি ট্রেন চট্টগ্রামে আটকে পড়ে। এরপর থেকে এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য এই পথে ট্রেন বন্ধ থাকার ঘটনা এবারই প্রথম।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ডুবে আছে: বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচল

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৪ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। এর মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত রেলপথের বিভিন্ন অংশ দেড় থেকে দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়।
পানি জমে যাওয়ার কারণে ওই দিন থেকেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রোববার সকাল ১০টা পর্যন্তও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
শনিবার সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় পানি নেমে গেলেও শমসেরপাড়ার প্রায় ২০০ মিটার রেলপথে প্রায় ৯ ইঞ্চি পানি ছিল। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত পানির গভীরতা ৬ ইঞ্চির নিচে না নামলে ওই পথে ট্রেন চালানো হয় না।
এই রুটে চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া এবং ঢাকা থেকে দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। ট্রেন বন্ধ থাকায় পর্যটক, চাকরিজীবী ও নিয়মিত যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
দীর্ঘ জলাবদ্ধতার পেছনে দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা
রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেলপথের পাশে থাকা নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, জলাশয় ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পানি দ্রুত সরতে পারেনি।
রেলপথের আশপাশের এলাকায় আগে অনেক বিল ও জলাশয় ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব জায়গার অনেক অংশ ভরাট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে খালের প্রতিরোধদেয়াল উঁচু হওয়া এবং নতুন খাল না খননের কারণেও পানি আটকে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন বলেন, এভাবে দীর্ঘ সময় রেললাইনে পানি জমে থাকার ঘটনা আগে দেখা যায়নি। এলাকাটি নিচু হওয়ায় এবং আশপাশের জলাধার কমে যাওয়ায় পানি আটকে আছে।
তিনি জানান, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে আপাতত তলিয়ে যাওয়া অংশ ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি উঁচু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নালা পরিষ্কার না থাকায় পানি নামতে সমস্যা
সরেজমিনে দেখা যায়, সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় রেলপথের দুই পাশের একটি বড় নালা পরিষ্কার থাকলেও অন্য একটি নালা আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ভরা ছিল। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা সেখানে পরিষ্কারের কাজ করছিলেন।
সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে নাজিরপাড়া পর্যন্ত নালার বিভিন্ন অংশেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
শমসেরপাড়ায় দেখা যায়, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ট্রলি চালিয়ে তলিয়ে যাওয়া রেললাইন পরিদর্শন করছেন। লাইনের এক পাশে মাটির স্তূপ এবং অন্য পাশে জমে থাকা পানি দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরুল আবসার (৬২) জানান, এবারের বৃষ্টিতে রেললাইনের পাশের তাঁর বাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছিল। তিনি বলেন, জীবনে এত দীর্ঘ সময় রেললাইনে পানি জমে থাকতে দেখেননি।
আগের ১১০ কোটি টাকার সংস্কার প্রকল্পেও দূর হয়নি সমস্যা
চট্টগ্রামের ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথ ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। এই পথে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১৯৩১ সালের ১০ জুন। স্বাধীনতার পর ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে একবার সংস্কার করা হয়।
পরবর্তীতে রেললাইনের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ষোলশহর-দোহাজারী ও ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট সেকশন পুনর্বাসন’ প্রকল্প নেওয়া হয়। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয় ১৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু ষোলশহর-দোহাজারী অংশে ব্যয় হয় প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
২০১১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালে। তবে প্রকল্পের আওতায় নিচু রেলপথ উঁচু করা হয়নি।
২০১৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যালাস্ট (পাথর) না দেওয়া, কিছু স্থানে রেললাইন আঁকাবাঁকা হওয়া এবং স্লিপারের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, আগের প্রকল্পে রেললাইন সংস্কার করা হলেও নিচু অংশ উঁচু করা হয়নি। আইএমইডির পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, তখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।
নতুন প্রকল্পে রেলপথ পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত করার একটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে চট্টগ্রাম নগরের নিচু অংশের রেললাইন প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত বুধবার তলিয়ে যাওয়া রেলপথ পরিদর্শনের সময় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রেললাইন উঁচু হলে ভবিষ্যতে ভারী বৃষ্টির সময় ট্রেন চলাচলে বাধা কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান রেলপথ নির্মাণে কোনো ত্রুটি নেই।
তিন দশক আগের ড্রেনেজ পরিকল্পনার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি
১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম নগরের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় শমসেরপাড়াসহ আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা কমাতে রেললাইনের সমান্তরালে নতুন খাল খননের সুপারিশ করা হয়েছিল।
একই সঙ্গে প্রায় ২০ হেক্টর এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য একটি জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় তিন দশক পার হলেও এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি।
সিডিএর উপপ্রধান নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন, বর্তমানে থাকা নোয়া খাল পানি নিষ্কাশনের জন্য যথেষ্ট নয় বলেই নতুন খালের সুপারিশ করা হয়েছিল।
তিনি জানান, জলাধার থাকলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সেখানে সংরক্ষণ করা যেত। এতে শমসেরপাড়ার রেললাইন ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার ঝুঁকি কমত।
আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে মিল
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ফেনী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সময় ফেনী থেকে হাসানপুর পর্যন্ত রেললাইন পানিতে ডুবে যায়। তখন চার দিন চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণাধীন রেলপথের একটি অংশ বন্যার পানিতে ডুবে যায়। ওই সময় পাথর ও মাটি সরে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ডুবে আছে ছয় দিন ধরে। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পুরোনো পরিকল্পনার অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রেলপথ উঁচু করার নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। তবে বর্তমানে দ্রুত পানি সরিয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করাই প্রধান লক্ষ্য।





