হরমুজ প্রণালিতে এক দিনে তিন জাহাজে গুলি : ওমান উপকূলে কনটেইনার জাহাজে , আইআরজিসি জড়িত বলে তথ্য জানিয়েছে ইউকেএমটিও।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জাহাজ হামলা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বুধবার একদিনেই অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক কনটেইনার জাহাজে গুলি ও গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ও যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO)। হামলার পেছনে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
ওমান উপকূল ও হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জাহাজ হামলা: কী ঘটেছে?

ওমানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমায় প্রথম হামলার শিকার হয় লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজ। UKMTO জানায়, জাহাজটির ওপর গুলি ও রকেটচালিত গ্রেনেড (RPG) নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে এর ‘ব্রিজ’ বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, IRGC-এর একটি গানবোট খুব কাছাকাছি এসে কোনো রেডিও যোগাযোগ ছাড়াই গুলি চালায়। তবে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জাহাজটিকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আরও দুটি জাহাজ একই এলাকায় হামলার শিকার হয়—
- পানামা পতাকাবাহী একটি জাহাজে গুলি চালানো হলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি
- লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজ মাঝসমুদ্রে থেমে যায়, তবে ক্রুরা নিরাপদ ছিলেন
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক শিপিং নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
IRGC-এর অবস্থান ও ইরানের দাবি
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো “সতর্কতা উপেক্ষা” করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমুদ্র আইন অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক সমুদ্র নিরাপত্তায় অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন রুট। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়েই যায়।
একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে এই পথ কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে প্রভাব ফেলছে।
যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে আরও জটিল হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং বলেছেন, আলোচনার অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ প্রত্যাহার না করলে নতুন আলোচনায় বসা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।
হরমুজ সংকটের বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে—
- বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে
- তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে
- আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে
এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।
অন্যান্য সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ
একই দিনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে—
- মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্র মজুতের বড় অংশ ব্যবহৃত হওয়ার তথ্য
- ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে নতুন যুদ্ধবিরতি আলোচনা
- ইরানে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক টানাপোড়েন
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জাহাজ হামলা শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক চাপ ও সংলাপই একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




