এক বছরে ৮ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন আইওএম জানায়, সবচেয়ে ঝুঁকিতে ভূমধ্যসাগর।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অভিবাসনপথে প্রায় ৮ হাজার মানুষ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ইউরোপ অভিমুখী ভূমধ্যসাগরীয় রুটে।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় অনেকেই “অদৃশ্য নৌযান ডুবে যাওয়া”র মতো দুর্ঘটনায় সমুদ্রে হারিয়ে গেছেন, যাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
আইওএমের উদ্বেগ: মানবিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি
আইওএমের মানবিক সহায়তা বিভাগের পরিচালক মারিয়া মোইতা বলেন, এসব পরিসংখ্যান শুধুমাত্র সংখ্যা নয়, বরং একটি বড় মানবিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে। তিনি উল্লেখ করেন,
“এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে আমরা এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো প্রতিরোধে এখনো যথেষ্ট কার্যকর হতে পারিনি।”

এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ পরিস্থিতি শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং নীতিগত ও মানবিক সংকটের অংশ।
এক বছরে ৭ হাজার ৯০৪ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর মোট ৭ হাজার ৯০৪ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে জাতিসংঘের কাছে তথ্য এসেছে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ১৯৭ জন, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।
তবে আইওএম জানায়, সহায়তা ও তথ্য সংগ্রহে ঘাটতির কারণে প্রায় ১ হাজার ৫০০ সন্দেহজনক ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভূমধ্যসাগর: সবচেয়ে প্রাণঘাতী রুট
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০টি অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ ঘটনার মধ্যে ৪টির বেশি ঘটেছে ইউরোপ অভিমুখী সমুদ্রপথে, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরে।
এই পথটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রুট হিসেবে পরিচিত। নৌকা ডুবে যাওয়া, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এবং উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি—সব মিলিয়ে এখানে প্রাণহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
২০১৪ সাল থেকে ভয়াবহ পরিসংখ্যান
আইওএম জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট ৮২ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এই সময়ে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা প্রমাণ করে যে, অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ সমস্যা কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান বৈশ্বিক সংকট।
“অদৃশ্য নৌযান” এবং নিখোঁজ ট্র্যাজেডি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে অভিবাসনপ্রত্যাশীবোঝাই নৌযান সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রে ডুবে গেছে বা নিখোঁজ হয়ে গেছে। এসব নৌযানের কোনো খোঁজ আর পাওয়া যায়নি, যা “অদৃশ্য নৌযান ডুবে যাওয়া” হিসেবে পরিচিত।
এই ধরনের ঘটনায় অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অভিবাসন প্রবণতায় পরিবর্তন
আইওএম বলছে, ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগমন সামগ্রিকভাবে কমলেও পথ ও উৎস দেশের পরিবর্তন ঘটেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন ইউরোপে সবচেয়ে বড় উৎস দেশগুলোর একটি।
অন্যদিকে সিরিয়া থেকে অভিবাসনপ্রবাহ কমে এসেছে। এসব পরিবর্তনের মধ্যেও অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও সতর্কবার্তা
আইওএম মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, সংঘাত, জলবায়ুগত চাপ এবং নীতিগত পরিবর্তনের কারণে অভিবাসনের পথ পরিবর্তন হলেও ঝুঁকি কমেনি।
তিনি বলেন, “এসব সংখ্যার পেছনে রয়েছে মানুষ, যারা একটি ভালো জীবনের সন্ধানে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হয়েছেন, এবং পরিবার যারা এখনো তাদের খবরের অপেক্ষায়।”
এই বক্তব্য অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ পরিস্থিতির মানবিক দিকটিকে আরও স্পষ্ট করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক সংকট
বিশ্বজুড়ে অভিবাসন সংকট নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। নিরাপদ অভিবাসন পথের অভাব, মানবপাচার চক্র এবং যুদ্ধ-সংঘাত এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ সংখ্যা কমানো এখন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।




